স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, ১৬ সেপ্টেম্বর ।। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও কয়েকটি হাইকোর্টে সম্প্রতি নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলেও তালিকায় নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এনভি রামানার সঙ্গে চার নারী বিচারপতির একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। ৩৪ সদস্যের সর্বোচ্চ আদালতে এটিই ছিল নারী বিচারপতির সর্বোচ্চ সংখ্যা, যাকে বলা হয়েছিল “ঐতিহাসিক মুহূর্ত”।
অনেকে আশা করেছিলেন, একে মোড় পরিবর্তন হিসাবে দেখেছিলেন এবং আশা করেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে নারী বিচারপতির সংখ্যা বাড়বে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দূর হবে লিঙ্গ বৈষম্য। কিন্তু চার বছর পর বাস্তবতা উল্টো। এখন আবারও আদালতটিকে অনেকেই বলছেন—“পুরুষদের ক্লাব”। সেই ছবিতে থাকা তিন নারী বিচারপতি—ইন্দিরা ব্যানার্জি, হিমা কোহলি ও বেলা এম ত্রিবেদী—ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। নতুন করে কোনও নারী বিচারপতি নিয়োগ না হওয়ায় এখন একমাত্র নারী বিচারপতি হিসেবে আছেন বি ভি নাগারথনা।
“এটা উদ্বেগজনক, এককথায় বিপর্যয়কর,” বিবিসি-কে বলেন আইনজীবী স্নেহা কলিতা, যিনি নারী আইনজীবীদের একটি সংগঠনের হয়ে ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন। ১৯৫০ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ৩৯ বছর লেগেছিল ভারতের প্রথম নারী বিচারপতি ফাতেমা বিবি নিয়োগ পেতে। ১৯৮৯ সালে ফাতিমা ভারতের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।
ফাতিমা বিবি ২০১৮ সালে ওয়েবসাইট স্ক্রলকে বলেন, “আমি একটি বন্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছি।” কিন্তু ৭৫ বছরে সর্বোচ্চ আদালতে নারী বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১, যা মোট নিয়োগ পাওয়া ২৮৭ বিচারপতির মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। স্নেহা কালিতা বলেন, “সর্বোচ্চ আদালতে আমাদের প্রতিনিধিত্ব আবার শূন্যের কোঠায় চলে গেছে। বর্তমানে নারী বিচারপতি মাত্র একজন। এটি পুরুষদের একটি ক্লাবে পরিণত হয়েছে।”
হাইকোর্টগুলোতেও চিত্র ভিন্ন নয়। সেখানে বর্তমানে নারী বিচারপতি ১০৩ জন, আর পুরুষ ৬৭০ জন। অন্তত চারটি হাইকোর্টে একটিও নারী বিচারপতি নেই। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে দুটি শূন্য পদে আবারও দুই পুরুষ বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যদিও অন্তত তিন নারী হাইকোর্ট বিচারপতি ছিলেন এর চেয়ে সিনিয়র।
এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনও “গভীর হতাশা” ও “গুরুতর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে। সংগঠনের সভাপতি বিকাশ সিং বলেন, নিম্ন আদালতে যেখানে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়, সেখানে ৪০ শতাংশ নারী বিচারপতি আছেন। কিন্তু উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে সংখ্যাটা ১০ শতাংশেরও কম।
“এখানে গুরুতর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আরও নারীকে খুঁজে বের করে নিয়োগ দিতে হবে,” বলেন বিকাশ সিং। আইনজীবী মাধবী দিবান মনে করেন, এটি কেবল নারীদের সমস্যা নয়, বরং গোটা সমাজের প্রতিফলন। আর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়না কোঠারি বলেন, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে বিচার বিভাগেও বৈচিত্র্য থাকা জরুরি—আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি লিঙ্গ বৈচিত্র্যও। “নারীরা দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক। তাদের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত বিচার বিভাগে,” বলেন তিনি।
কোঠারি আরও বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বেঞ্চে নারী বিচারপতির উপস্থিতি অন্য বিচারপতি ও আইনজীবীদের লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য ঠেকাতেও ভূমিকা রাখে। বিতর্ক উঠেছে, নারীদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করা উচিত কি না। সমালোচকেরা মনে করেন, এতে মেধার সঙ্গে আপস হবে। তবে স্নেহা কলিতার মতে, নারীরা পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ পরিশ্রম করেন—পেশার পাশাপাশি সংসার ও সন্তান লালনও সামলান। “অনেক নারী পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী। কেবল নারী হওয়ার কারণে তাদের বাদ দেওয়া বৈষম্য ছাড়া কিছুই নয়,” বলেন তিনি। জয়না কোঠারির প্রস্তাব, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে নারী বিচারপতির সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। “বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তরে আরও বেশি নারী এলে, অনেক তরুণী আইন পেশায় টিকে থাকার অনুপ্রেরণা পাবেন। নইলে তারা ভাববেন—এত পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত যদি শীর্ষে পৌঁছানো না যায়, তবে এর মানে কী?” প্রশ্ন তোলেন তিনি।

