বাড়িরাজ্যদায়িত্বের মাঝেই থেমে গেল পথচলা, ডিজিপি-র মৃত্যুতে শোকের ছায়া

দায়িত্বের মাঝেই থেমে গেল পথচলা, ডিজিপি-র মৃত্যুতে শোকের ছায়া



আগরতলা, ২০ জুলাই (হি.স.) : ত্রিপুরা পুলিশের মহানির্দেশক (ডিজিপি) অনুরাগ ধনকরের ঝুলন্ত মৃতদেহ সোমবার পুলিশের সদর দফতরে তাঁর নিজ অফিস কক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনায রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত তাঁকে আগরতলায় জিবিপি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল আনুমানিক ১১টা ৩০ থেকে ১১টা ৪০ মিনিটের মধ্যে ডিজিপি-র অফিস কক্ষের বাইরে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা ঘরের ভেতর থেকে একটি অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা কক্ষে প্রবেশ করে দেখেন, ডিজিপি অনুরাগ ধননকর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছেন। নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত তাঁকে নিচে নামিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জিবিপি হাসপাতালে নিয়ে যান।

সকাল ১১টা ৫৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ২ মিনিটের মধ্যে তাঁকে জিবি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। এর আগেই খবর পেয়ে হাসপাতালের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জরুরি বিভাগে উপস্থিত ছিলেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরপরই তাঁকে বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চিকিৎসা শুরু হয়।

চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার সময় থেকেই তাঁর শরীরে কোনও পালস, রক্তচাপ বা স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে কার্ডিও-পালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) এবং অন্যান্য জরুরি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা শুরু হয়। প্রায় ৪৮ মিনিট ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চিকিৎসক দল তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালান। কিন্তু সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

জিবিপি হাসপাতালের বিশিষ্ট চিকিৎসক প্রদীপ ভৌমিক সাংবাদিকদের জানান, ডিজিপি-কে হাসপাতালে আনার সময়ই তিনি কার্যত “ব্রট ডেড” অবস্থায় ছিলেন। তবুও চিকিৎসা প্রোটোকল অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে সিপিআরসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

ডিজিপি-র মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই জিবিপি হাসপাতাল চত্বরে তাঁর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা ভেঙে পড়েন। কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। খবর পেয়ে রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিক এবং পুলিশ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে যান।

রাজ্যের সর্বোচ্চ পুলিশ আধিকারিকের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে রাজ্যজুড়ে নানা মহলে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। যদিও ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তদন্তের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এই ঘটনায় রাজ্য প্রশাসন, পুলিশ মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

অনুরাগ ধনকর ২০২৫ সালের ১৭ মে ত্রিপুরার পুলিশ মহানির্দেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার আগে তিনি ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মহানির্দেশক (আইন ও শৃঙ্খলা)-এর দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশ মহানির্দেশক (গোয়েন্দা) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত দক্ষতার জন্য তিনি পুলিশ মহলে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন।

ত্রিপুরা পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অনুরাগ ধনকর ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের (আইপিএস) ১৯৯৪ ব্যাচের আধিকারিক। শিক্ষাজীবনে তিনি মহীশূরের সেন্ট্রাল ফুড টেকনোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিএফটিআরআই) থেকে ফুড টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুলিশ ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স এবং হায়দরাবাদের নালসার ইউনিভার্সিটি অব ল থেকে সাইবার ক্রাইমসে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা লাভ করেন তিনি।

১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ত্রিপুরার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। লংতরাইভ্যালির এসডিপিও, অবিভক্ত পশ্চিম ও দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার পুলিশ সুপার, স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সুপার এবং এআইজিপি হিসেবে তিনি সফলভাবে কাজ করেন।

২০০৩-০৪ সালে তিনি কসোভোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে থেকে সিবিআই-তে এসপি ও ডিআইজি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ত্রিপুরায় ফিরে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আইজিপি (আইন ও শৃঙ্খলা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীকালে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পুনরায় কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে গিয়ে তিনি সিবিআই-এর যুগ্ম পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালক, ব্যুরো অব পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিপিআরঅ্যান্ডডি)-এর গবেষণা ও সংশোধনমূলক প্রশাসন বিভাগের আইজি এবং সিআইএসএফ-এর আইজি (পার্সোনেল) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান।

এছাড়া, ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার তদন্তে গঠিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্র্ মন্ত্রকের বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

একজন দক্ষ, সৎ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে অনুরাগ ধনকরের পরিচিতি ছিল সর্বমহলে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনিক মহল, পুলিশ বাহিনী এবং বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য