স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, আগরতলা। ৯ জুলাই : ত্রিপুরা এখন দেশের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান রাজ্য। গত মাত্র ছয় বছরে রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিএসডিপি) দ্বিগুণ হয়েছে। বৃহস্পতিবার আগরতলার আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ‘ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ-২০২৬’-এ এই দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহা।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন (ডোনার) ও যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার জাতীয় সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ, জলপথ এবং শক্তিশালী ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এছাড়াও ত্রিপুরায় রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস, বিশাল রাবার বাগান, জিআই-স্বীকৃত কুইন আনারস, উন্নতমানের আগর, বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ এবং সমৃদ্ধ উদ্যানপালন।
তিনি জানান, ত্রিপুরা দেশের তৃতীয় পূর্ণ সাক্ষর রাজ্য এবং এখানে দক্ষ ও প্রযুক্তিগত জনশক্তির অভাব নেই। এখন বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত সময় এসেছে। সেই লক্ষ্যেই ৪৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর এবং সংস্থার অংশগ্রহণে এই বৃহৎ বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ৫০০-রও বেশি শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারী এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। “এক ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা” গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ, সর্বকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে ত্রিপুরাকে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি জানান, ভূমি, নগর পরিকল্পনা, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক নীতিগত সংস্কার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘রিফর্ম এক্সপ্রেস’-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিয়ম শিথিলকরণ এবং কমপ্লায়েন্স হ্রাসের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ত্রিপুরা দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
ড. সাহা বলেন, শিল্প ও ব্যবসার অনুমোদনের জন্য ‘সোয়াগাত‘ (SWAAGAT) নামে সিঙ্গল উইন্ডো পোর্টাল চালু করা হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন ব্যবস্থা, সহজতর জমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং শিল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া আরও সরল করা হয়েছে। সামাজিক, শিক্ষামূলক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য সরকারি জমি স্বল্প মূল্যে লিজ দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, ত্রিপুরায় বর্তমানে ১ লক্ষ ৫৮ হাজার হেক্টর প্রাকৃতিক রাবার বাগান রয়েছে, যা দেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম। শান্তিরবাজারে একটি নতুন রাবার পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রও থাকবে। সেখানে উন্নতমানের রাবারজাত পণ্য, সার্জিক্যাল ও শিল্পকারখানার গ্লাভস, ফোম এবং ল্যাটেক্সভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রাবার কাঠভিত্তিক প্লাইউড, ভিনিয়ার এবং বায়োচার শিল্পেও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজ্যে ৪৫ হাজার হেক্টরে শিল্পভিত্তিক বাঁশ চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং উনকোটিতে একটি সমন্বিত বাঁশ ভ্যালু চেইন পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া ২.২৭ কোটি আগর গাছ নিয়ে ত্রিপুরা বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান আগর উৎপাদন কেন্দ্র। আগর তেল, আতর, সুগন্ধি, হাইড্রোসল ও ওয়েলনেস পণ্য উৎপাদনেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
কৃষি ও উদ্যানপালন ক্ষেত্রে কোল্ড চেইন, টিস্যু কালচার, আনারস ও কাঁঠাল প্রক্রিয়াকরণ, ফাইবার নিষ্কাশন, শুকনো ফল প্রক্রিয়াকরণ, ধানের তুষ ও ভূষি থেকে তেল উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
মৎস্য খাতে মাছের খাদ্য উৎপাদন, ক্লাস্টারভিত্তিক মাছ চাষ, শুকনো ও ফারমেন্টেড মাছ প্রক্রিয়াকরণ, আধুনিক মাছ বাজার, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড এবং অ্যাকুয়া ট্যুরিজমের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপুরার ৮৫৬ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকায় রাজ্যটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে উঠছে। আগরতলা-আখাউড়া আন্তর্জাতিক রেল সংযোগ, মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উন্নীতকরণ, সবরুমের মৈত্রী সেতুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ এবং সোনামুড়া-দাউদকান্দি অভ্যন্তরীণ জলপথের মাধ্যমে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ভবিষ্যতে লজিস্টিকস ও মালবাহী পরিবহনে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
এছাড়া লজিস্টিক পার্ক, গুদামজাতকরণ, কোল্ড চেইন, মালবাহী হাব, বৈদ্যুতিক যানবাহন, বাণিজ্যিক পাইলট প্রশিক্ষণ, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, হেলিপোর্ট, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং ডম্বুর লেকে সি-প্লেন পরিষেবার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ফার্মাসিউটিক্যালস, বায়োটেকনোলজি ও চিকিৎসা উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ত্রিপুরাকে গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্যে ত্রিপুরা আইটি অ্যান্ড ডেটা ইকোসিস্টেম জোন (TIDEZ), ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন পার্ক এবং অত্যাধুনিক আইটি পার্ক নির্মাণের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, এবারের ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ–২০২৬-এ ৭০০-রও বেশি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন এবং ২৫০টিরও বেশি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হচ্ছে, যার সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।
মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, “টিম ত্রিপুরা”-র সক্রিয় সহযোগিতায় এই সমঝোতা স্মারকগুলির অধিকাংশই অদূর ভবিষ্যতে বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেবে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, ঊর্ধ্বতন সরকারি আধিকারিক, নয়টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী এবং বিশিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

