স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, আগরতলা। ২৮ নভেম্বর : হেজামারা ব্লকের বৈকুণ্ঠপুর ও চাঁদপুর তহশিল এলাকায় উত্তেজনার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় শুক্রবার । খবরে জানা যায় স্থানীয় ব্লকের রেভিনিউ সার্কেল কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ওই অঞ্চলের ২৭ জন জনজাতি পরিবারের হাতে জমি ডিমার্কেশনের নোটিশ ধরিয়ে দেয়। প্রশাসনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ‘দখল’ থাকা জমির সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারগুলোর পাল্টা প্রশ্ন, যে জমিতে তাঁদের তিন-চার প্রজন্ম ধরে বসবাস, রাবার বাগান ও ফলের বাগান আছে, যেখানে রয়েছে বাড়িঘর, সেই জমিকে হঠাৎ করে ‘বিতর্কিত’ দেখানোর ভিত্তিটাইবা কী ? ৮০ বছরের বসতি তার পরও কেন ডিমার্কেশন ? বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৭২ একর জমিতে তাঁরা ৮০ বছর ধরে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করছেন।
স্থানীয় মহিলাদের বক্তব্য, “আমাদের দাদু-ঠাকুরদাদের সময় থেকে আমরা এখানে। হঠাৎ করে ডিমার্কেশন হবে মানে কী ?আমাদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে। এই অভিযোগের পরেই উত্তেজনা চরমে ওঠে। তহশিলদার ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই ক্ষুব্ধ মহিলারা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে বিক্ষোভে শামিল হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ঘটনার পর বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে,
এত পুরনো বসতি এলাকার জমির ডিমার্কেশন কেন একতরফাভাবে করা হবে ? কার নির্দেশে জমি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হল ? স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা বা গ্রামসভা মতামত কেন নেওয়া হলো না ? সংবিধানের ৫ম তফসিলভুক্ত এলাকা বা জনজাতি প্রাধান্যপূর্ণ অঞ্চলে জমি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের সম্মতি, এবং গ্রামসভার অংশগ্রহণ, আইনি ও নীতিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ন্যূনতম প্রক্রিয়াটিও মানা হয়নি। জনজাতি অধিকার আইন, Forest Rights Act (FRA) 2006 অনুসারে যদিও জমিটি বনভূমি কিনা তা প্রশাসন পরিষ্কার করেনি, তবুও এই আইন অনুযায়ী, ST সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত বসতি, দীর্ঘদিনের চাষাবাদ বা বাগান, বা পরিবারভিত্তিক ব্যবহারযোগ্য জমি, সবই সুরক্ষিত অধিকার হিসেবে বিবেচিত। ডিমার্কেশনের সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের মতামত বাধ্যতামূলক।Tripura Land Revenue and Land Reforms Act, 1960, এই আইনে তফসিলি জনজাতির হাতে থাকা জমি অতিরিক্ত সুরক্ষা পায়। ST পরিবারের জমি পুনর্বিন্যাস, অধিগ্রহণ বা পরিবর্তন করতে গেলে বিশেষ অনুমতি লাগে।হঠাৎ নোটিশ দিয়ে ডিমার্কেশন করা আইনসঙ্গত প্রক্রিয়া হিসেবে কতটা স্বচ্ছ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।স্থানীয় জনজাতি সংগঠনগুলির বক্তব্য, ST জমির ওপর প্রশাসনের এই ধরনের সিদ্ধান্ত সংবিধান ও রাজ্য আইনের সুরক্ষাকে অগ্রাহ্য করে। তবে আইন অনুযায়ী কোনও প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু কোনও সরকারি আধিকারিককে কাজে বাধা দেওয়া আইনের দৃষ্টিতে দণ্ডনীয়। অন্যদিকে ঘটনাটির মূল কারণ প্রশাসনের অস্পষ্ট নোটিশ ও যোগাযোগের ঘাটতি খতিয়ে দেখা উচিত। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে জনজাতি বাসিন্দাদের বিশ্বাসের ফাঁক, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, এবং জমি-অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলির সংবেদনশীলতা অনুধাবন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ডিমার্কেশন হবে কি না, জমির আইনগত অবস্থান কী? এসব প্রশ্ন এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এক বিষয় পরিষ্কার, বাসিন্দাদের না জানিয়ে, তাঁদের উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করে কোনও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চাপালে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হতে পারে।

