স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, ৩০ আগস্ট।। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠেয় সামরিক কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং—এক ফ্রেমে। শুধু ছবি নয়, এটি শি’র এক বড় কূটনৈতিক জয়ও বটে।
বিশ্বমঞ্চে চীনের ক্ষমতা প্রদর্শনে বরাবরই সচেষ্ট শি। কেবল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসাবে নয়, কূটনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ হিসাবেও চীনকে তুলে ধরতে চাইছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি যখন অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ওলটপালট করে দিয়েছে, তখন স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীনের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন শি।
আর এখন, যখন ট্রাম্প ইউক্রেইন যুদ্ধ থামাতে একটি চুক্তি করার জন্য এখন পর্যন্ত পুতিনকে রাজি করাতে পারেননি, তখন শি জিনপিং প্রস্তুতি নিচ্ছেন বেইজিংয়ে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর। ওদিকে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের অংশগ্রহণের আকস্মিক ঘোষাণাটাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। এ সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে ট্রাম্পের এর আগের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সাফল্য আনতে পারেনি, যদিও তা বিশ্বের মনোযোগ কেড়েছিল। তবু ওয়াশিংটনের ইঙ্গিত—ট্রাম্প আবারও চেষ্টা করতে চান। তবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন দুজনের ওপরই সীমিত হলেও প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন তিনি। এর মাধ্যমে শি সংকেত দিচ্ছেন যে, ভূ-রাজনীতির এই খেলায় আসল কার্ড সম্ভবত তার হাতেই। কিম ও পুতিনের ওপর তার প্রভাব সীমিত হলেও যে কোনও চুক্তির ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগামী ৩ সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে, যা চীনকে দখলদারিত্ব মুক্ত করেছিল।
তবে শি জিনপিং এটিকে আরও বড় এক প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত করেছেন। তাছাড়া, এবার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, অক্টোবরে শেষ দিকে এশিয়া সফরে করতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং শি’র সঙ্গে বৈঠক করতেও তিনি প্রস্তুত। আলোচনার টেবিলে থাকবে বহুল আলোচিত শুল্ক চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক বিক্রি, ইউক্রেইনে যুদ্ধবিরতি বা আরও বেশিকিছু করার জন্য পুতিনকে রাজি করাতে বেইজিংয়ের ভূমিকা সবই। ওই সময় কিম ও পুতিন দুজনের সঙ্গেই বৈঠক সেরে শি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারবেন বাদ পড়ে থাকার অনুভূতি ছাড়াই। অর্থাৎ, তাকে বাদ রেখে কোনও আলোচনা হবে এমন সম্ভাবনা থাকবে না। আবার কিম ও পুতিন- দুই নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে শি এমন তথ্যও পেতে পারেন, যা ট্রাম্পের কাছে নাও থাকতে পারে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখে রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া দুইই আজ বিচ্ছিন্ন দেশ। কিম তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে পুতিনের চেয়েও অনেক বেশি দিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন। আর পুতিন বিচ্ছিন্ন ইউক্রেইনে যুদ্ধ করার কারণে। কিম ইউক্রেইন যুদ্ধে পুতিনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে নতুন করে নিন্দা-সমালোচনার শিকার হচ্ছেন। তাই কিমকে চীনের আমন্ত্রণ তার জন্য বড় একটি পদক্ষেপ। শেষবার কোনও উত্তর কোরীয় নেতা চীনে সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। ২০১৯ সালের পর থেকে শি ও কিমের মধ্যে প্রকাশ্য যোগাযোগ হয়েছে খুব কমই। ২০১৯ দুই দেশের নেতা চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিমের বৈঠকের আগে বেইজিংই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া আর রাশিয়ার সখ্যতার মাঝে চীনের প্রেসিডেন্ট শি যেন অনেকটা আড়ালেই চলে গেছেন বলে মনে হচ্ছিল; বেইজিং হয়ত এর মধ্যে থাকতে চাইছিল না। কারণ, চীন ইউক্রেইন যুদ্ধে প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ থাকারই চেষ্টা করেছে। যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের অভিযোগ, চীন এমন সব উপাদান রাশিয়াকে সরবরাহ করছে, যা তারা যুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। কিছু বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, পুতিনের সঙ্গে কিমের ঘনিষ্ঠতা বাড়ার কারণে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কিমের আসন্ন চীন সফর ভিন্ন আভাসই দিচ্ছে। এটি এমন এক সম্পর্ক, যা কিম জং-উন সহজে ছিন্ন করতে পারবেন না। কারণ, তার দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। উত্তর কোরিয়ার খাদ্য আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে চীন থেকে।আর বেইজিংয়ের মঞ্চে কেবল পুতিন ও শি নয়, বরং ইন্দোনেশিয়া, ইরান প্রভৃতি দেশের নেতাদের সঙ্গে উপস্থিতিও কিমকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিচ্ছে। ওদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি-এর জন্য এটি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় একটি কূটনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের সুবিধা বয়ে আনছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে এখনও আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে কোনও চুক্তি করা যায়। আরও ৯০ দিনের জন্য দেওয়া উচ্চশুল্কে বিরতির সময়ও দ্রুত ফুরোচ্ছে। তাই শি চাইবেন আলোচনায় সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে। তার দেওয়ার মতো অনেক কিছুই আছে। অতীতে কিম জং-উনের সঙ্গে ট্রাম্পকে বৈঠকে বসতে সহায়তা করেছিলেন শি জিনপিং। আবারও কি তিনি সেটি করতে পারেন? কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল: ইউক্রেইন যুদ্ধ শেষ করতে চীন কী ভূমিকা রাখতে পারে? আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হল: শি, পুতিন, কিম এবং ডনাল্ড ট্রাম্প- এই চার নেতার কোনও বৈঠক কি হতে পারে?

