Thursday, February 5, 2026
বাড়িবিশ্ব সংবাদযুদ্ধের পর বন্যা: বারবার বাস্তুহীন, অতিষ্ঠ পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা

যুদ্ধের পর বন্যা: বারবার বাস্তুহীন, অতিষ্ঠ পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা

স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, ১ সেপ্টেম্বর।। চলতি মাসে বন্যার পানি যখন ভারতের সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত গ্রামে হু হু করে ঢুকতে শুরু করে, শামা জানতেন তাকে কী করতে হবে- চার সন্তানকে জড়ো করো, আর বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি নাও। এ নিয়ে ২০২৫ সালেই দ্বিতীয়বারের মত তাকে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হল। এর আগে মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষের সময়ও তাকে একবার নিজের প্রতিদিনকার আশ্রয় ছেড়ে যেতে হয়েছিল।

“আর কতবার ঘর ছাড়তে হবে?” বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে জিজ্ঞাসা ৩০ বছর বয়সী এ মায়ের। তার স্বামী তখন নৌকায় করে তাদের ১০টি গরু নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে রাখার উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। “যুদ্ধের সময় শিশুদের পড়াশোনার সময় গেল, অনেক কিছু হারালাম। এবার বন্যার পানি এসে তাড়াচ্ছে। কষ্টই কষ্ট,” বলেন শামা। তার মতো কাসুরের বন্যাদুর্গত হাজারো মানুষের একই দশা। পরিবারগুলো বলছে, কয়েক মাসের ব্যবধানে, যুদ্ধ আর বন্যায় বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ায় তারা অতিষ্ঠ। “চলতি মাসের শুরু থেকে বন্যা শুরু হয়েছে, দিন দিন বন্যার পরিস্থিতি কেবল খারাপই হচ্ছে,” বলেছেন ২৭ বছর বয়সী আরেক মা বিবি জুবাইদা। সাত আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে তিন কক্ষের একটি বাড়িতে থাকেন তিনি। তার ঠিক উল্টো দিকেই মসজিদ। যেখান থেকে এখন বারবারই নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। যে মসজিদের মাইক ছিল আজানের জন্য, সেখান থেকেই এখন আসছে ভিন্ন বার্তা, “যারা যারা যেতে চাও, নৌকা প্রস্তুত রয়েছে।” “আপনি এখানে থাকেন মানে আপনি যুদ্ধের ঝুঁকি, বন্যার ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটানোর পথ বেছে নিয়েছেন। কোথায় যাবে মানুষ?,” বলছেন জুবাইদা। কাসুর ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। এখানকার বাসিন্দাদের বাড়ির ছাদ আর উদ্ধার নৌকা থেকে সামনে তাকালেই ভারতীয় সীমান্ত চৌকি দেখা যায়। যা মনে করিয়ে দেয়, দেশদুটির মধ্যে যে কারও নেওয়া সিদ্ধান্ত কীভাবে অন্য দেশের বাসিন্দাদের ওপর প্রভাব ফেলে। ছয় দশক সিন্ধু পানি চুক্তি মেনে দুই দেশ তাদের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর পানি ভাগ করে নিয়েছে। কিন্তু এ বছরের শুরুতে পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারত চুক্তিটি স্থগিত করে। পাকিস্তান ওই হামলার সঙ্গে যোগসাজশ থাকার দায় অস্বীকার করলেও উত্তেজনা কমেনি। পরে দুই দেশের মধ্যে দিনকয়েক সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি, হামলা-পাল্টা হামলা দেখা যায়। ওই সংঘর্ষ শামার মতো অনেককেই বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে। তারপর সংঘাত থামলো, বাড়ি ফিরলেন শামারা। এল বর্ষাকাল, এবার নদী উপচে পানি ঢোকা শুরু করল লোকালয়ে। আবার বাড়ি ছাড়তে হল শামাদেরকে। পরিবারগুলো তাদের শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে গৃহপালিত গরু-ছাগল, মোটরসাইকেল আর সামান্য মালপত্র নিয়ে কোনোমতে কাঠের সরু নৌকায় জায়গা করে নেন। এরপর উদ্ধারকারী নৌকা ছুটে চলে ফসলের ক্ষেতের ওপর দিয়ে, বন্যা যেগুলো নদীতে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকর্মী মুহাম্মদ আর্সালান জানান, অনেক গ্রামবাসীই বাড়ি ছাড়তে ইতস্তত করেন। “মানুষ ভাবে, ফিরে এসে দেখবে চোর-ডাকাত সব নিয়ে গেছে। এতবার বাড়ি ছাড়তে হয়েছে যে আর ছাড়তে চায় না তারা। তারা তাদের ছাগল-ভেড়াকেও ভালোবাসে, এবং অনেক সময় এগুলোকে না নিয়ে বাড়ি ছাড়তে রাজিও হয় না,” নৌকার মটরে আটকে যাওয়া পাতা সরাতে সরাতে বলেন আর্সালান।

গত কয়েকদিনে তিনি দেড় হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়েছেন। পাঞ্জাবের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলছে, সুতলেজ নদীর গন্ডা সিং ওয়ালায় পানির প্রবাহ কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ২৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পাঞ্জাবের ভেতর দিয়ে পানি এখন আরও দক্ষিণে নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করছে। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দশকের পর দশক ধরে নয়া দিল্লি যেভাবে নদী সংক্রান্ত তথ্য ভাগ করে নিচ্ছিল, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। “চুক্তি কার্যকর থাকলে, আমরা হয়তো বন্যার প্রভাব আরও ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারতাম,” শুক্রবার রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল । তবে ভারত বলছে, তারা ইচ্ছে করে পাকিস্তানকে প্লাবিত করেনি। তারা প্রবল বৃষ্টিকে দায় দিয়েছে এবং একাধিক বন্যা সতর্কতা জারি করার কথাও জানিয়েছে। ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, রাভি নদীতে পানির প্রবল স্রোতে তাদের মাধোপুর বাঁধের দুটি গেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের কৃষকরা বলছেন, এবারের প্লাবন তাদের জীবনজীবিকা ধ্বংস করে দিয়েছে। “আমার ১৫ একরের মধ্যে ১৩ একরই শেষ,” বলেছেন ধান ও সবজিচাষী মুহাম্মদ আমজাদ। “নারী ও শিশুদেরই মূলত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাকি যা আছে তা পাহারা দিতে পুরুষরা থেকে গেছেন,” বলেছেন তিনি। যুদ্ধ আর বন্যায় কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর বাস্তুচ্যুতি পাকিস্তানের অস্থির পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের বাসিন্দাদের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বর্ষায় বৃষ্টির তীব্রতা বৃদ্ধি এবং নদী নিয়ে বিরোধের কারণে দুর্যোগ মোকাবেলার পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই অঞ্চলগুলোর মানুষের বিপদ আরও বাড়বে বলে অনেকে আশঙ্কাও করছেন। “জীবনে অনেক বন্যা দেখেছি, কিন্তু এখন খুব ঘন ঘন হচ্ছে। ১৯৮৮, ২০২৩ আর এবারকার বন্যা মনে থাকবে,” বলেছেন ৭৪ বছর বয়সী নবাবউদ্দিন। জুবাইদা কিছুদিন আগেই তার বাড়িটি নতুন করে সংস্কার করেছিলেন। সেই বাড়ি এবং আবাদি জমি সবই এখন পানি নিচে। তিনি বলছেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, বাড়তি পানিও চাই না। শুধু বাঁচতে চাই।”

সম্পরকিত প্রবন্ধ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে
Captcha verification failed!
CAPTCHA user score failed. Please contact us!

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য