স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, আগরতলা। ৪ সেপ্টেম্বর :শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে বিভিন্ন সরকার এবং প্রযুক্তি সংস্থার উপরও চাপ বাড়ছে।
চলতি বছরের মার্চে WhatsApp ১৩ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অ্যাকাউন্টের নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে। অন্যদিকে, অগাস্টে Meta মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। সেখানে শিশুদের বয়স যাচাই আরও শক্তিশালী করা, ১৩ বছরের কম বয়সীদের Facebook ও Instagram থেকে দূরে রাখা এবং কিশোরদের বয়স-উপযোগী অ্যাকাউন্টে রাখার মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা ব্যবহারের সীমা, রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত শিশুদের অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং ‘লাইক’ সংখ্যার মতো কিছু তথ্য গোপন করার ব্যবস্থার কথাও রয়েছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি আগামী শিক্ষাবর্ষে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের জেনারেটিভ AI টুল ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন স্ক্রিন-টাইম নীতি ঘোষণা করেছেন। ফ্রান্সেও স্কুলপড়ুয়াদের মোবাইল ফোন ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। দেশটির হাইস্কুলগুলিতে মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর হয়েছে।
মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে অতিরিক্ত স্ক্রিন
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের নিউরোডেভেলপমেন্ট বা মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
আকাশ হেলথকেয়ারের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট, সাইকিয়াট্রি বিভাগের ডা. পবিত্র শঙ্করের মতে, প্রি-টিন বয়সে মস্তিষ্কের পুরস্কার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সার্কিটগুলি এখনও বিকশিত হচ্ছে।
শর্ট-ফর্ম ভিডিও এবং গেম-ভিত্তিক অ্যাপ দ্রুত ও অনিয়মিতভাবে আনন্দ বা উত্তেজনার অনুভূতি তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের কনটেন্ট ব্যবহারের ফলে পড়াশোনা, বই পড়া বা মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের মতো ধীরগতির বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ড তুলনামূলকভাবে একঘেয়ে মনে হতে পারে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।
ভারতের Economic Survey 2025–26-এও শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে শর্ট-ফর্ম ভিডিও, জেনারেটিভ AI চ্যাটবট এবং গেমিং স্ট্রিমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা মানবসম্পদ গঠন, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কখন স্ক্রিন ব্যবহার সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়?
ফর্টিস হেলথকেয়ার এবং Adayu Mindfulness-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সমীর পারিখ বলেন, কোনও শিশু বা কিশোর অবসর পেলেই যদি স্বাভাবিকভাবে অন্য কোনও কাজের পরিবর্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটে যায়, তাহলে বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ডিজিটাল ব্যবহার মনোযোগ, একাগ্রতা এবং সামগ্রিক মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও বাড়ে। এর প্রভাব সামাজিক জীবন ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও পড়তে পারে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলাদা করে ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’ নামে কোনও স্বতন্ত্র ক্লিনিক্যাল রোগ নির্ণয় নেই। সমস্যা তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন ডিজিটাল ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। WHO-এর ICD-11-এ ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’-কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যখন কেউ গেম খেলার উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, অন্য কাজের তুলনায় গেমিংকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তা চালিয়ে যায়।
স্ক্রিনে আসক্তির সম্ভাব্য লক্ষণ
- খাবার বা বাড়ির কাজ দ্রুত শেষ করে আবার ডিভাইসে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা
- বারবার স্ক্রিন পরীক্ষা করা
- কখন আবার ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে তা নিয়ে অস্থির থাকা
- আগে পছন্দের কাজগুলিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- অনলাইনে কী করছে তা লুকানোর চেষ্টা করা
- একঘেয়েমি সহ্য করতে না পারা
- ডিভাইস ব্যবহারে বাধা দিলে হুমকি, আক্রমণাত্মক আচরণ বা জিনিসপত্র ভাঙচুর করা
- ডিভাইস ছাড়া নিজেকে শান্ত করতে না পারা
আর্তেমিস হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাহুল চাঁদহোকের মতে, ডিভাইস সরিয়ে নিলে বারবার বড় ধরনের অশান্তি তৈরি হলে এবং শিশু সেটি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে চলতে না পারলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
অভিভাবকরা কী করবেন?
নিয়ম তৈরি করুন: নির্দিষ্ট স্ক্রিন-টাইম ঠিক করুন। খাবার খাওয়ার সময় এবং ঘুমের আগে ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
ঘুমকে গুরুত্ব দিন: রাতে মোবাইল, ট্যাবলেট এবং গেমিং ডিভাইস শিশুর শোবার ঘরের বাইরে রাখুন।
শুধু সরিয়ে নেবেন না, বিকল্প দিন: খেলাধুলা, বই পড়া, গান, শখের কাজ, বাইরে সময় কাটানো এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ান।
নিজে উদাহরণ তৈরি করুন: খাবার, কথোপকথন এবং পারিবারিক সময়ের মধ্যে অভিভাবকরাও ফোন দূরে রাখুন।
সমস্যার গভীরে যান: অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের পেছনে মানসিক, আচরণগত বা বিকাশগত সমস্যা থাকতে পারে। স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অথবা ঘুম, পড়াশোনা, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
শাস্তি নয়, প্রয়োজন বোঝাপড়া
ডা. চাঁদহোক সতর্ক করে বলেন, স্ক্রিন নিয়ে সন্তানের প্রতিটি ঝগড়াকে ‘আসক্তি’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আবার বড় ধরনের আচরণগত পরিবর্তনকেও শুধুমাত্র ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যা, পড়াশোনার অবনতি, সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, নিজের আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং স্ক্রিন ব্যবহারে বাধা দিলে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
এক্ষেত্রে প্রথমেই শাস্তি, অপমান বা ভয় দেখানোর পথ না নিয়ে শান্তভাবে নিয়ম তৈরি করা এবং সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগের চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান