Friday, August 7, 2026
বাড়ি বিশ্ব সংবাদ উত্তর কোরিয়ার কারাগার: জীবন যেখানে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক

উত্তর কোরিয়ার কারাগার: জীবন যেখানে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক

উত্তর কোরিয়ার কারাগার: জীবন যেখানে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক
স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক। আগরতলা। ২৯ মার্চ।  কারাগারে ছোট দরজার কক্ষের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকানোর পর শাস্তি হিসেবে লি ইয়ং-জুকে পা ‍মুড়ে হাঁটুর উপর দুই হাত রেখে বসে থাকতে বলা হয়। দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় তাকে নড়াচড়া করতে দেওয়া হয় না।

এমনকী একটু এলোমেলো হয়ে থাকা বা সেলের অন্য বন্দিদের সঙ্গে সামান্য কানাকানি করলেও কঠিন শাস্তি নেমে আসে। লি জানান, তাকে খুব কম পানি এবং খাবার হিসেবে শুধু কিছু ভুট্টার গুড়া দেওয়া হত।‘‘নিজেকে আমার মানুষ নয় প্রাণী মনে হত।” দক্ষিণ কোরিয়ায় বসে বিবিসি-কে এভাবেই নিজের ভয়ঙ্কর ওই অভিজ্ঞার কথা বলেন লি। তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে পালানোর কারণে তাকে বন্দি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হত।২০০৭ সালে উত্তর কোরিয়া থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন লি। কিন্তু তিনি চীনে ধরা পড়ে যান এবং তাকে ফেরত পাঠানো হয়।চীন সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার অনসং ডিনেটশন সেন্টারে তিনি তিন মাস বন্দি ছিলেন এবং বিচারের জন্য অপেক্ষা করেছেন। তারপরও তিনি হাল ছাড়েননি। কারাগারের সেলে বসে অন্য বন্দিদের সঙ্গে গোপনে তিনি আবারও পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতেন।

তিনি বলেন, ‘‘আমরা আবারও পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতাম, দালালদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা। সেসব কথাবার্তা খুবই গোপন ছিল।”উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের ভয় দেখিয়ে দেশত্যাগ করা থেকে নিবৃত্ত করতেই সাজা হিসেবে কারাবন্দি রাখা হয়। কিন্তু লি বা কারাকক্ষে তার অন্যান্য সঙ্গীদের উপর সেই ভয় দেখানো যে খুব একটা কাজ করেনি সেটি স্পষ্ট। দেশ ত্যাগের চেষ্টার জন্য বেশিরভাগই সাজার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু লি’র পরিকল্পনা জানাজানি হয়ে যায়।এরপর কারগারে কী ধরনের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তার বর্ণনায় লি বলেন, ‘‘কারারক্ষী আমাকে গারদের দরজার কাছে এসে শিকের মধ্য দিয়ে হাত বের করতে বলে। তারপর সে চাবির একটি রিং দিয়ে আমার হাতে পেটাতে শুরু করে। যতক্ষণ পর্যন্ত না পুরো হাত ফুলে নীলচে হয়ে যায়।

“নিজের গর্ববোধ থেকে আমি না কাঁদার করার চেষ্টা করেছি। যারা উত্তর কোরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কারারক্ষীরা তাদেরকে বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী বলে মনে করে।”লি বলেন, ‘‘আপনি নিজের কারাকক্ষ থেকে অন্য কক্ষে মারধরের আওয়াজ পাবেন। কারণ সব সেলে যাওয়ার করিডর একটাই। আমি তিন নম্বর সেলে ছিলাম এবং ১০ নম্বর সেলে মারধরের আওয়াজ পেয়েছি।”উত্তর কোরিয়ার কারাগারে আন্তর্জাতিক আইনের কতটা লঙ্ঘন হয় তা বিস্তারিতভাবে তদন্ত করে দেখতে ‍‘কোরিয়া ফিউচার’ নামে একটি সংগঠন দুইশ’র বেশি বন্দির সঙ্গে কথা বলেছে। লি তাদের একজন।মানবাধিকার সংগঠন কোরিয়া ফিউচার ১৪৮টি কারাগারে ৭৫৮ জন বন্দির বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার ১৮১টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এবং এর পেছনে দায়ী ৫৯৭ জনকে চিহ্নিত করেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই তথ্যগুলো এই আশায় সংগ্রহ করা হয়েছে যে, একদিন ওইসব অপরাধীর কেউ না কেউ বিচারের আওতায় আসবে।

যদিও উত্তর কোরিয়া সবসময় তার দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে বিবিসি থেকে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে হয়েছে।কিন্তু কোরিয়া ফিউচার লোকজনকে কারাগারের অবস্থা সচক্ষে দেখানোর জন্য অনসং বন্দিশালার একটি থ্রিডি মডেলও তৈরি করেছে।দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে কোরিয়া ফিউচারের সহপরিচালক বিবিসি-কে বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার কারাগার ব্যবস্থা এবং এর ভেতরে যে সহিংসতা চলে তা সেদেশের জনগণকে দমিয়ে রাখার জন্যই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা প্রতিজনের সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রেই কারাগারের নির্মমতা তাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে তার সাক্ষী হয়েছি।  একজন সাক্ষাৎকারে বন্দিজীবনের বর্ণনায় এক নবজাতককে হত্যার ঘটনা চাক্ষুস দেখার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছেন।”

অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে উত্তর কোরিয়া এখন বাকি বিশ্ব থেকে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার দেশটি শাসন করছে এবং দেশটির নাগরিকদের কিম পরিবার ও দেশটির বর্তমান নেতা কিম জং উনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য দেখাতে হয়।সেখানে কেউ যদি বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে তবে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হয়। এমনকি সেখানে বিদেশি সিনেমা বা নাটক দেখাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।সেখানে শাসন ব্যবস্থায় বার বার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং প্রতিটি কারাগারেই একই অবস্থা। সেখানে অনেক কারাগারে বন্দিদের ধর্ষণ এবং এ ধরনের অন্যান্য যৌন নীপিড়ন করার অভিযোগ রয়েছে।

কোরিয়া ফিউচারের সঙ্গে কথা বলার সময় অনেকে বলেছেন, তাদের এমনকী জোর করে গর্ভপাতও করা হয়েছে।এমন একটি ঘটনার বর্ণনায় একজন বলেন, নর্থ হামগিঅং প্রাদেশিক ডিটেনশন সেন্টারে একজন বন্দিকে আট মাসে গর্ভপাত করা হয়। শিশুটি সে সময় বেঁচে ছিল এবং তাকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।বিচারে লি-র সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড হয়। তিনি বলেন, ‘‘আমি চিন্তায় ছিলাম এই সাড়ে তিন বছরের মেয়াদ শেষ করতে গিয়ে আমি মরে না যাই।

‘‘যখন আপনি এ ধরনের বন্দিশালায় ঢুকবেন তখন আপনার নিজেকে মানুষ মনে হবে না। নিজের ধৈর্য এবং বেঁচে থাকার ইচ্ছা পরিত্যাগ করতে হবে।”সাইরম নামে আরেক জনও ২০০৭ সালে অনসং ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি ছিলেন। সেখানে কতটা নির্মমভাবে পেটোনো হয় সেকথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘‘তারা আপনার উরুতে কাঠের লাঠি দিয়ে মারবে। আপনি হেঁটে ঢুকবেন কিন্তু হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে হবে।”‘‘যখন অন্যদের মারতো আমি তাদের দিকে তাকাতে পারতাম না। কিন্তু যদি আমি আমার মাথা ঘুরিয়ে নিতাম তারা আমাকে সেটা দেখতে বাধ্য করত। তারা আপনার আত্মাকে হত্যা করে।”“যদি কোনও উপায় থাকে, আমি চাই তারা শাস্তি পাক”, বলেন সাইরম। দক্ষিণ কোরিয়া নতুন জীবনে এখন খুব ভালো আছেন তিনি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছেন।তারা উত্তর কোরিয়ায় যা ভোগ করেছেন তার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব। তারপরও সাবেক বন্দিদের দেওয়া সাক্ষ্য প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গ্রহণযোগ্য হতেও পারে।সাইরম এবং লি আশা করছেন, এইসব তথ্য প্রমাণ তাদেরকে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে দেবে।

Abhishek Dey
সাংবাদিক (Journalist)

মন্তব্য সমূহ (0)

  • এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

আপনার মতামত জানান

Captcha