Thursday, February 5, 2026
বাড়িবিশ্ব সংবাদভারত-পাকিস্তানের মাঝে আটকে রাষ্ট্রহীন দুই বোন

ভারত-পাকিস্তানের মাঝে আটকে রাষ্ট্রহীন দুই বোন

স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, ৩ সেপ্টেম্বর।। ভারতের কেরালা রাজ্যে বাস করা দুই বোন এখন কার্যত রাষ্ট্রহীন। পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদ না পাওয়ায় তারা ভারতীয় নাগরিকত্বও পাচ্ছেন না। সম্প্রতি আদালতকে এই দুই বোন জানিয়েছেন, ২০০৮ সাল থেকে তারা কেরালায় বসবাস করে আসছেন। ২০১৭ সালে দিল্লিতে পাকিস্তানের হাইকমিশনে জমা দেন তাদের পাসপোর্ট। তবে তখনও তাদের বয়স ছিল ২১ বছরের নিচে—যা পাকিস্তানের নাগরিকত্ব ত্যাগের ন্যূনতম শর্ত। ফলে হাইকমিশন তাদের আবেদন গ্রহণ করলেও নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদ দেয়নি।

পরে ২১ বছর হওয়ার পর আবারও আবেদন করলেও কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই পাকিস্তান হাইকমিশন তা প্রত্যাখ্যান করে বলে জানিয়েছেন দুই বোনের মা রাশিদা বানু। মা রাশিদা ও তার ছেলে ইতোমধ্যে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেয়েছেন। কিন্তু দুই মেয়ের নাগরিকত্ব নিয়ে টানাপোড়েনে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রাশিদা। “পাসপোর্ট না থাকায় তারা কোথাও যেতে পারে না, এমনকি নিজের স্বামীর কাছেও নয়। জীবন থমকে গেছে। তারা এমনকি পাসপোর্টের জন্যও আবেদন করতে পারে না,” বলেন রাশিদা বানু। বিবিসি এ বিষয়ে ভারতে পাকিস্তানের হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনও সাড়া পায়নি। দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক প্রায়ই বৈরিতায় মোড় নেয়। এ বছরের মে মাসেও দুই দেশের মধ্যে চার দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছিল। তারপরও দুই দেশের মধ্যে অভিবাসন বিরল ঘটনা নয়। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যে পরিবারের সদস্যরা সীমান্তের দুই পারে রয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা রয়েছে।

গত কয়েক দশকে নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ে কড়াকড়ি বেড়ে যাওয়ায় অভিবাসন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের হিসাবমতে, ভারত সরকারের কাছে ৭ হাজারের বেশি পাকিস্তানির নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে পার্লামেন্টে উপস্থাপিত তথ্যে। রাশিদা বানু বলেন, ভারতে পাকিস্তানের হাইকমিশন তার মেয়েদের নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তিনি দুই বোনের পাসপোর্ট ফেরত চেয়ে আবেদন করলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালে পাকিস্তান হাইকমিশন দুই বোনকে একটি সনদ দিয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল যে তারা পাসপোর্ট জমা দিয়েছে এবং ভারত তাদেরকে নাগরিকত্ব দিলে পাকিস্তানের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু ভারত সরকার পাকিস্তানের নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদের বদলে এই দলিল নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ পরিস্থিতিতে আদালতের আশ্রয় নেন দুই বোন। মামলা যায় কেরালা হাইকোর্টে। গত বছর কেরালা হাইকোর্টের একক বেঞ্চ তাদের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু চলতি বছরের ২৩ অগাস্ট একই আদালতের দুই বিচারপতির বেঞ্চ আগের রায় বাতিল করে দেয়। রায়ে বলা হয়,ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হতে হলে কাউকে কেবল ভারত রাষ্ট্রের স্বীকৃত হতে হবে। অন্য কোনও দেশের সরকারের কোনও দাবি থাকা যাবে না। আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া হল সেই ব্যবস্থা, যা আইনগত সুষ্পষ্টতা নিশ্চিত করবে। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদনের সুযোগ রয়েছে দুই বোনের। পাকিস্তানের আইনানুযায়ী, ২১ বছরের কম বয়সীরা স্বাধীনভাবে তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে পারেন না। তবে তাদের বাবার করা নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিবিসি লিখেছে, দুই বোনের পরিবারটির কাহিনী জটিল। তাদের বাবা মোহাম্মদ মারুফ জন্মেছিলেন কেরালায়। ৯ বছর বয়সে এতিম হয়ে গেলে তার দাদি তাকে দত্তক নেন। ১৯৭৭ সালে মারুফকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে চলে যান তার দাদি।

মা রাশিদা বানুর বাবা-মাও ছিলেন ভারতীয়; কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সীমান্ত বন্ধ থাকায় তারা পাকিস্তানে আটকা পড়েন এবং সেদেশের নাগরিকত্ব নিতে বাধ্য হন। এর কয়েক বছর পর রাশিদা বানুর জন্ম হয়। ২০০৮ সালে রাশিদা ও মারুফ চার সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভিসায় ভারতে আসেন শিকড়ের কাছাকাছি থাকার জন্য। তবে পরে মারুফ ভারতীয় সমাজে মানিয়ে নিতে না পেরে ফিরে যান পাকিস্তানে। রাশিদা ও তার ছেলের বয়স ২১ বছরের বেশি হওয়ায় তারা ভারতের নাগরিকত্ব পান। কিন্তু দুই মেয়ে এখনও ‘ঝুলে থাকা অবস্থায়’। ভারতের নাগরিকত্ব না থাকায় সাধারণ কাজকর্মও হয়ে উঠেছে দুরূহ। মোবাইল সিম বা স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়। যদিও দুই বোন আধার কার্ড পেয়েছেন, কিন্তু সেটি এখনও নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হয় না। পাসপোর্ট না থাকায় সহসাই বিপদে পড়তে হয় ব্যক্তিজীবনে। একজন বোনের স্বামী বিদেশ থেকে চাকরি ছেড়ে ভারতে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যজনের ছেলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারছে না। “২০১৭ সালে তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে সনদ পায়নি। এখন প্রাপ্তবয়স্ক হলেও পাসপোর্ট নেই, ফলে পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার উপায় নেই। কার্যত তারা আটকে গেছেন,” বলেছেন তাদের আইনজীবী এম সসীন্দ্রন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে
Captcha verification failed!
CAPTCHA user score failed. Please contact us!

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য