স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, ২৯ আগস্ট।। পাকিস্তান গত এক সপ্তাহে পাঞ্জাবের বন্যা দুর্গত এলাকাগুলো থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভারি বৃষ্টিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি উপচে পড়ায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় হাজারের বেশি গ্রাম তলিয়ে গেছে, ডুবেছে ফসলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব এলাকাও। বর্ষার টানা বৃষ্টি এবং প্রতিবেশী ভারত তাদের বাঁধগুলো থেকে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার পর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটিতে বয়ে যাওয়া তিনটি প্রধান নদী ফুলে উঠে প্রায় দেড় হাজার গ্রাম ডুবেছে, কোথাও কোথাও কর্তৃপক্ষকে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ভাঙতে বাধ্য করেছে বলে জানিয়েছে পাঞ্জাবের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
চেনাব নদীর পানি উপচে হঠাৎ বন্যার কারণে কাদিরাবাদের মতো অনেক গ্রামের বাসিন্দাদের বৃহস্পতিবার বুক সমান পানিতে হাঁটতে হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। “আমরা সারা রাত ধরে জেগে ছিলাম, আতঙ্কে ছিলাম। সবাই আতঙ্কে ছিল। বাচ্চারা কেঁদেছে। নারীরা ছিল উদ্বিগ্ন। আমরা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম,” নিজের এক সন্তানকে নিয়ে হেঁটে পানি পার হওয়ার সময় বলছিলেন ২৬ বছর বয়সী মজুর নাদিম ইকবাল। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বাস পাঞ্জাবে; দেশটির গম, চাল ও তুলা উৎপাদনের প্রধান অঞ্চলও এটি। কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত তাদের বাঁধ পূর্ণ হওয়ার পর সেখান থেকে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় চেনাবের পাশাপাশি রাভি ও সুতলেজ নদীর পানিও বিপদসীমা অতিক্রম করে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ভারত তাদের বাঁধগুলো পানিতে পূর্ণ হয়ে গেলে, নিয়মিতিই অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়। তবে এবার পানি ছাড়ার আগে তারা পাকিস্তানকে ‘মানবিক কারণে’ তিন দফা সতর্কবার্তা দিয়েছিল। এবার বর্ষার ভারি বৃষ্টির কারণে ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশকেই ব্যাপক বন্যার সাক্ষী হতে হয়েছে। চলতি মাসে কেবল ভারতের কাশ্মীরেই বন্যায় অন্তত ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে, পাকিস্তানে জুনের পর থেকে বন্যায় মৃত্যু ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। চেনাব নদীর পানি বৃহস্পতিবার এত উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছির যে তা কাদিরাবাদে তিন হাজার ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের কংক্রিটের বাঁধে ফাটল ধরানোর হুমকি সৃষ্টি করেছিল। এই বাঁধটি নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং কিছু পানি খাল দিয়ে সেচের নেটওয়ার্কে সরিয়ে দেয়। বাঁধটি ফেটে গেলে কাছাকাছি দুটি শহর তলিয়ে যেত। এই বিপদ এড়াতে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে দুই জায়গায় নদী তীর রক্ষা বাঁধ ভেঙে দিয়ে কাছাকাছি এলাকায় পানি ঢুকিয়ে দেয় বলে জানিয়েছে প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়ার প্যাটার্ন বদলে যাওয়ার কারণেই পাকিস্তানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায়ই মারাত্মক বন্যার দেখা মিলছে বলে মত কর্মকর্তাদের। ২০২২ সালে বর্ষার রেকর্ড বৃষ্টিতে সৃষ্ট নজিরবিহীন বন্যা সড়ক, ফসল, সেতু ও নানান স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়েছিল, মৃত্যু হয়েছিল হাজারের বেশি মানুষের। বন্যায় এরই মধ্যে এক হাজার ৬৯২ মৌজার প্রায় ১৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাব সরকার। তারা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার অভিযানও চালিয়েছে। এরই মধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। চেনাব নদীর পানি উপচে ৯৯১টি গ্রাম তলিয়েছে; সুতলেজের পানিতে ডুবেছে ৩৬১টি গ্রাম, রাভিতে প্লাবিত হয়েছে আরও ৮০টি। সামনের দিনগুলোতে আরও বৃষ্টিপাত হবে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে পাঞ্জাবের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে বলেই আশঙ্কা আবহাওয়া বিভাগের। বন্যার কারণে শিয়ালকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমও বিঘ্নিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ডন। বৃহস্পতিবার ওই বিমানবন্দরের কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। রানওয়ে এবং টার্মিনাল নিরাপদে আছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার কাজ চলছে, বলেছেন বিমানবন্দরের এক মুখপাত্র।

