বাড়িরাজ্যনীতি আয়োগের বৈঠকে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে ত্রিপুরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেন...

নীতি আয়োগের বৈঠকে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে ত্রিপুরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেন মুখ্যমন্ত্রী

নয়াদিল্লি: দেশের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২ বছর পূর্ণ করায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা। নীতি আয়োগের ১১তম গভর্নিং কাউন্সিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করে এই শুভেচ্ছা বার্তা দেন ডাঃ সাহা।

               “বিকশিত ভারতের জন্য মানবসম্পদ” শীর্ষক এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিল ভারতের সমষ্টিগত চিন্তাধারা, সহযোগিতামূলক ফেডারেল কাঠামো এবং গঠনমূলক নীতি-সংলাপের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।

               মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রিপুরা সরকার ‘বিকশিত ভারত @ ২০৪৭’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প ‘লক্ষ্য ২০৪৭’ গ্রহণ করেছে। যার উদ্দেশ্য সকল নাগরিকের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

               ডাঃ সাহা উল্লেখ করেন, গত ছয় বছরে রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GSDP) দ্বিগুণ হয়েছে এবং ত্রিপুরা বর্তমানে দেশের তৃতীয় পূর্ণ সাক্ষর রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। গত আট বছরে রাজ্য ৩৫০টিরও বেশি জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কার লাভ করেছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে ‘হোল অব গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মিশন মুকুল-এর মাধ্যমে শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পূর্বেই বিদ্যালয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করা হচ্ছে। প্রতিটি ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমেরেসি (FLN) শ্রেণিকক্ষে নিপুণ কর্নার স্থাপন করা হয়েছে এবং নবভর্তি প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যা-সেতু মডিউল চালু করা হয়েছে।

                    মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ত্রিপুরা স্কুল কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাক্রেডিটেশন ফ্রেমওয়ার্ক (TSQAAF) তৈরি করা হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে স্মার্ট ক্লাসরুম এবং টিঙ্কারিং ল্যাব স্থাপন করে শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পিএম-শ্রী প্রকল্পের আওতায় ৮৪টি বিদ্যালয় এবং বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পের অধীনে ১২৫টি মডেল স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ‘বন্দে ত্রিপুরা’ শিক্ষা চ্যানেল প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করছে।

                     মুখ্যমন্ত্রী ‘সহর্ষ’ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা, একাগ্রতা, জ্ঞানীয় দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উচ্চশিক্ষার প্রসারে নতুন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি কলেজে অ্যালামনাই সেল গঠন করা হয়েছে।

                 মুখ্যমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পোষণ ট্র্যাকার-এর মাধ্যমে ৩ লক্ষেরও বেশি আধার-যাচাইকৃত উপভোক্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নীতি আয়োগের সহযোগিতায় ১২৫টি বিদ্যালয়ে নার্স নিয়োগের মাধ্যমে স্কুল হেলথ মিশন চালু করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সুস্থ শৈশব সুস্থ কৈশোর অভিযান (MSSSKA)-এর মাধ্যমে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নে পরিচালিত আটটি অভিযানে প্রায় ৯৮ শতাংশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। একইসঙ্গে, মুখ্যমন্ত্রী নিরাময় আরোগ্য অভিযান-এর মাধ্যমে ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে সকল নাগরিককে অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরসমূহ NQAS স্বীকৃতি অর্জন করেছে, যার ফলে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি হয়েছে; এমবিবিএস আসন সংখ্যা ২২৫ থেকে বেড়ে ৫৫০ এবং স্নাতকোত্তর আসন সংখ্যা ৮৫ থেকে বেড়ে ১৯৬ হয়েছে।

                     মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা আরো বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমানে রাজ্যের প্রায় ৪.৯৬ লক্ষ গ্রামীণ মহিলা ৫৫,৬৭৬টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। সমৃদ্ধি অভিযান নারীদের ঋণপ্রাপ্তি বৃদ্ধি করেছে এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগকে এমএসএমই খাতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। এছাড়া ত্রিপুরা মহিলা উদ্যোক্তা নীতি ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাজ্যে মহিলা শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার ৩৭.৫ শতাংশ থেকে ৪৫.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মহিলাদের রাত্রিকালীন শিফটে কাজ করার সুযোগও প্রদান করা হয়েছে।

                     মুখ্যমন্ত্রী জানান, দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে টাটা টেকনোলজিসের সহযোগিতায় আইটিআইগুলিকে আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে। এছাড়া রামকৃষ্ণ মিশনের সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ড স্কিল সেন্টার এবং স্কুল অব ল্যাঙ্গুয়েজেস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহৎ পরিসরে নল জল মিত্রদের প্রশিক্ষণও প্রদান করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির “রিফর্ম এক্সপ্রেস”-এ আরোহণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ত্রিপুরা ডিরেগুলেশন ও কমপ্লায়েন্স রিডাকশনের প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় পর্যায়েই দেশের সকল রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

                       ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, গত এক বছরে রাজ্যে ৩০,০০০ কোটিরও বেশি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে এবং ৮,০০০ কোটিরও বেশি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। ভারতি এয়ারটেল সহ বিভিন্ন সংস্থা আগরতলায় পূর্ব ভারতের জন্য ডেটা সেন্টার স্থাপন করছে। পর্যটনের বিকাশে মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী পর্যটন সার্কিট এবং বৌদ্ধ সার্কিট উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পুষ্পবন্ত প্রাসাদ টাটা গোষ্ঠীর আইএইচসিএল-এর মাধ্যমে বিশ্বমানের তাজ হেরিটেজ হোটেল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

                     মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা মন্ত্রিসভা থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও পেপারলেস করা হয়েছে। iGOT প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত সাধনা সপ্তাহ কর্মসূচিতে ত্রিপুরা গ্রুপ-এ রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। যুব উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে স্টেট ইনোভেশন মিশন এবং টি-নেস্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

                             মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য লিখিত আকারে নীতি আয়োগের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে ‘বিকশিত ভারত’ গঠনের জাতীয় লক্ষ্যে ত্রিপুরার অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং নীতি আয়োগের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় এই বৈঠকের আলোচনা দেশের সার্বিক উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত হবে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য