Saturday, June 15, 2024
বাড়িখেলাইয়ুর্গেন ক্লপ: ব্ল্যাক ফরেস্টের সাধারণ একজন থেকে লিভারপুলের পুনরুত্থানের নায়ক

ইয়ুর্গেন ক্লপ: ব্ল্যাক ফরেস্টের সাধারণ একজন থেকে লিভারপুলের পুনরুত্থানের নায়ক

স্যন্দন ডিজিটেল ডেস্ক, ১৮ মে: ব্লন্ড চুলের মোটা ফ্রেমের চশমা পরা লোকটি নেমে আসছেন গাড়ি থেকে। মুখের হাসি ঠোঁটের কোনায় শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চিবুক পর্যন্ত। কালো কোট পরা সেই মানুষটা যখন অ্যানফিল্ড রোডের পথ ধরে আসছিলেন, তখন মার্সেসাইডের লাল অংশের মলিন আকাশটার থমথমে মেঘ যে ধীরে ধীরে জট খুলছিল, তা কেউ দেখেনি। কিন্তু খুলছিল ঠিকই।এরপর সেই লোকটি মুখের চওড়া হাসি নিয়েই প্রথমবারের মতো হেঁটে গেলেন অ্যানফিল্ডে ঘাসের ওপর দিয়ে। কেউ দেখেনি, তাঁর পায়ের স্পর্শে সেদিন বহু বছর ধরে নির্জীব হয়ে পড়া ঘাসগুলো নতুন করে প্রাণ খুঁজে পেয়েছিল। এরপর তিনি যখন ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলেন, দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো ঝুলতে থাকা জার্সিগুলোরও যে পুনরুত্থান ঘটছিল, তা–ও কেউ দেখেনি। একটু পর তিনি আঙুলের ইশারায় জাগিয়ে তুললেন ‘দিস ইজ অ্যানফিল্ড’ লেখা প্রবেশদ্বারকে। আরও অনেকবার সেই পথ দিয়ে হেঁটে এসে অসাধারণ সব রূপকথার গল্প ও ইতিহাস লিখেছিলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ নামের মানুষটি। যে মানুষটির লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণায় প্রায় ৮ বছর পর শান্তিতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা পাচ্ছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ পেপ গার্দিওলাও।

ব্ল্যাক ফরেস্ট নামের গাছ ও পাহাড়ঘেরা জার্মানির এক গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন ক্লপ। নিজের সম্পর্কে যিনি বলেন, ‘আমি ব্ল্যাক ফরেস্ট থেকে আসা এক সাধারণ মানুষ।’ নিজের সম্পর্কে এমন বিনয়ী মনোভাব নিয়ে থাকাটা ব্ল্যাক ফরেস্টের পরিবেশই ক্লপকে শিখিয়েছে। মাইলের পর মাইল চোখধাঁধানো সবুজ, সারিবদ্ধ ছোট ছোট পাহাড় এবং মাটির ঘ্রাণে নাক ডুবিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষটি আর যা–ই হোন, অন্তত উদ্ধত হতে পারেন না। ক্লপকে নিয়ে তাঁর এক বন্ধু বলেছিলেন, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ একজন মানুষ সে। সব সময় হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকা এবং মুখে হাসি লেগে থাকা একজন।’ পরিবেশের সঙ্গে ক্লপের চরিত্রে যোগ হয়েছে শান্ত মা ও চটপটে বাবার নানা গুণও।

তবে ব্ল্যাক ফরেস্টের হাওয়া-বাতাস এবং মানুষগুলো ক্লপের ভেতর যে দারুণ বৈশিষ্ট্য খোদাই করেছে, তা হলো স্বাধীনচেতা মনোবৃত্তি। কোনো প্রলোভনে আটকে না পড়ার মানসিকতা এবং নিজের জীবন-দর্শনের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস না করা।নয়তো আধুনিক ফুটবলের অর্থের হাতছানি এবং সাফল্যের ক্ষুধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্লপ বলতে পারতেন না, ‘আমার এখন বিশ্রাম দরকার।’

এই মানুষটি সত্যিই সাধারণ একজন বা ‘নরমাল ওয়ান।’ কিন্তু মানুষ এতটা সাধারণও আসলে এখন আর হয় না। ক্লপ যখন লিভারপুল ছেড়ে বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন তিনি নিজে ছাড়া আর কেউ এমন কিছু কল্পনা করতে পারেননি। এ সময়ের ফুটবলে সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে কোচ বদলের মধ্যেও যে অল্প কজন কোচ নিজেদের চাকরি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার বিলাসিতা দেখাতে পারেন, ক্লপ তাঁদের একজন। কিন্তু এরপরও ক্লপ নিজের চাওয়াকেই সবকিছু ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। যখন কেউ চায়নি, তখনই তিনি ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।অতি সাধারণ এই বৈশিষ্ট্যই মূলত ক্লপকে আলাদা করেছে বাকিদের থেকে। আর এই সাধারণ হয়ে থাকতে পারাটা ক্লপের সাফল্যের অন্যতম কারণও বটে। ক্লপের এই সাধারণ হয়ে থাকা নিয়ে লম্বা সময় ধরে তাঁর এজেন্ট হিসেবে কাজ করা মার্ক কোসিকে বলেছিলেন, ‘ইয়ুর্গেন (ক্লপ) একেবারেই সাধারণ। কিন্তু এই বিষয়টিই ক্ষিপ্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে অস্বাভাবিক।’ যে কারণে ক্লপের জয়ের আনন্দ বা হারের হতাশার প্রকাশকে অনেক সময়ই স্বাভাবিক নিতে পারে না সংবাদমাধ্যমগুলো। অথচ তারা বুঝতেই পারে না, ক্লপ এমনই। আর সাধারণ মানুষের আবেগের প্রকাশ তো এমনই হয়।

খেলোয়াড় হিসেবে কখনোই বড় নাম হয়ে উঠতে পারেননি ক্লপ। জার্মান ক্লাব মেইঞ্জে খেলাটাই ছিল তাঁর সর্বোচ্চ অর্জন। খেলা হয়নি জার্মানির জাতীয় দলেও। কে জানত, নিয়তি তাঁর জন্য যে ভিন্ন কিছুই ভেবে রেখেছিল! খেলোয়াড় হিসেবে চূড়ান্ত সাফল্য না পেলেও খেলতেই খেলতেই হয়ে ওঠেন চৌকস এক নেতাও। বলা হতো, ‘ক্লপের মস্তিষ্ক ছিল প্রথম শ্রেণির এবং পা ছিল চতুর্থ শ্রেণির।’ এতে অবশ্য ক্ষতির চেয়ে লাভ হয়েছে বেশি। খেলোয়াড় হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের পথে হাঁটতে না পারার কারণেই কোচ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পান ক্লপ। প্রথম শ্রেণির মস্তিষ্কের কারণেই খেলোয়াড় থাকা অবস্থাতেই মেইঞ্জের কোচের দায়িত্ব পান ক্লপ। তিনি যখন কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৩।

কোচ হিসেবে ক্লপের সাফল্যের বড় কারণ তাঁর দূরদর্শী কৌশল। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে শুধু কৌশলই সব নয়, এর সঙ্গে কিছু এক্স ফ্যাক্টরও থাকতে হয়। ক্লপের সেই এক্স ফ্যাক্টর নিয়ে কোসিকে বলেছিলেন, ‘সে ফুটবলকে সেভাবে বোঝে, যেভাবে বোঝা প্রয়োজন। কিন্তু তার আসল যোগ্যতা হচ্ছে খেলোয়াড়দের সঙ্গে বোঝাপড়া। তার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা খোদ সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন। কখন কী বলতে হয়, সেটা তার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।’জার্মান ভাষায় একটা শব্দ আছে ‘মেনশনফাঙ্গার’। যার অর্থ মানুষকে আকৃষ্ট করা। ক্লপ হচ্ছেন এই কথাটির প্রতিভূ। নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়েই ড্রেসিংরুমের ৭০ ভাগ জয় করতে পারতেন তিনি। আর এই গুণকে কাজে লাগিয়েই অবিকশিত প্রতিভাবান ফুটবলারদের ধরে এনে শতভাগ বের করে আনতে পারেন এই জার্মান। রবার্ট লেভানডফস্কি থেকে শুরু করে মোহাম্মদ সালাহরা ক্লপের এই গুণেরই ফসল। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ক্লপের আত্মিক বন্ধনটা এতটাই দৃঢ় যে বলা হয়, ক্লপের জন্য তাঁর খেলোয়াড়েরা প্রয়োজনে জীবনও দিতে পারেন।

এই স্পিরিটটাই যখন মাঠের ফুটবলে অনূদিত হয়, তখন অখ্যাত ও অবিকশিত সেই ফুটবলাররাই হয়ে ওঠেন সেরাদের সেরা। আর তাঁদের হাত ধরেই আসে দারুণ সব সাফল্য। কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে ক্লপের এই চারিত্রিক দৃঢ়তার কারণেই বিপ্লব ঘটে যায় মেইঞ্জের মতো অখ্যাত ক্লাবে, এই কারণেই বায়ার্নের দাপট ভেঙে বুন্দেসলিগার দুটি শিরোপা জিততে পারে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড এবং পুনরুত্থিত হয় ঐতিহ্যের ফসিলে পরিণত হওয়া লিভারপুলও।

ক্লপের শিষ্য হিসেবে ছয় বছর লিভারপুলে থাকা অ্যালেক্স অক্সালেড চ্যাম্বারলেইন একবার বলেছিলেন, ‘সে দারুণভাবে উজ্জীবিত করতে পারে। সবার ভেতর থেকে সবটা বের করে আনতে পরে। ভেতরের বিশ্বাসটাকে জাগিয়ে দিতে পারে।’ মূলত মানুষের সম্ভাবনার যে সীমা, সেটার চূড়া স্পর্শ করার পারঙ্গমতায় ক্লপকে করে তুলেছে কোচদের কোচ। হয়তো সাফল্য, পরিসংখ্যান বা ট্রফি ক্যাবিনেট বিবেচনায় ক্লপ কারও কারও চেয়ে পিছিয়ে থাকবেন। কিন্তু হারতে থাকা ও হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষদের ভেতর ফুটবল-মঞ্চে বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে দেওয়া একজন মানুষ হিসেবে ক্লপ সত্যিই অনন্য। স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়া মানুষদের তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়। অবিশ্বাসীদের শিখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বাস করতে হয়।

সবাইকে জাগিয়ে তোলা এই মানুষটিই আবার সবকিছু চাকচিক্য ও উজ্জ্বলতা থেকে নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করেন। ২০১৬ সালে ডেইলি মেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্লপ বলেছিলেন, ‘ফুটবলের এই যে রঙিন দুনিয়া, আমি তার অংশ নই। আমি সেখানে নেই। আমি সেটা উপভোগ করি না।’ সবুজ মাঠটাই মূলত ক্লপের পৃথিবী। এটাকে ঘিরেই তাঁর সমস্ত ভাবনা। তবে সাধারণ মানুষের কাছে ফুটবলের যে আবেদন, সেটাকেও সবকিছু ঊর্ধ্বে স্থান দেন ক্লপ।

ফুটবলের প্রতি এই যে নিবেদন ও আত্মত্যাগ, তার প্রতিদানও কিন্তু ক্লপ পেয়েছেন। যেসব জায়গায় বছরের পর বছর কেউ ফুল ফোটাতে পারেনি, যেখানে অনেক বছর ধরে প্রাণের স্পর্শ পড়েনি, সেই জায়গাগুলোতে ক্লপ রীতিমতো সাফল্যের বাগান তৈরি করেছেন। তিনি হচ্ছেন সেই জাদুকর, যার কথা ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইয়ে বলেছিলেন বিখ্যাত ফুটবল সাহিত্যিক এদোয়ার্দো গালেয়ানো। কোচদের প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, ‘ম্যানেজার মনে করে ফুটবল হলো বিজ্ঞান, আর মাঠ তার পরীক্ষাগার। কিন্তু আইনস্টাইনের মেধা এবং ফ্রয়েডের সূক্ষ্মতা দলের মালিক বা ভক্তদের কাছে যথেষ্ট নয়। তারা চায় লেডি অব লর্ডসের মতো অলৌকিক কিছু দেখতে। সঙ্গে দেখতে চায় মহাত্মা গান্ধীর মতো চারিত্রিক দৃঢ়তাও।’ গত প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে এসব গুণ যেন ক্লপের ওভারকোট থেকে তুরুপের তাসের মতো একে একে বেরিয়ে এসেছে।ফুটবলের রঙিন দুনিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেও ক্লপ কিন্তু রাজনীতি বা সমাজবিমুখ মানুষ নন। যে কারণে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে নিজের মতামত দিতে পেরেছিলেন। কিংবা নির্বাচনে ট্রাম্প ও বরিস জনসনের জয়কে তিনি নেতিবাচক বার্তা হিসেবেই দেখেছিলেন। আর বাম পন্থার প্রতি তাঁর পক্ষপাতও স্পষ্ট। যে কারণে তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি যা কখনো করব না, তা হলো কখনো ডানপন্থীদের ভোট দেব না।’ রাজনৈতিকভাবে বিভাজনে না পড়তে কোচ-খেলোয়াড়দের বেশির ভাগকেই এ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে দেখা যায়। কিন্তু ক্লপ তো একজনই। নিজের বিশ্বাস ও পছন্দের কথা তাই স্পষ্ট করেই বলতে পারেন তিনি।

ফুটবল রোমান্টিক হিসেবে খেলাটি নিয়ে ক্লপের বিবেচনাবোধ একেবারেই আলাদা। ক্যারিয়ারে কটি শিরোপা জিতেছেন (১৩টি) তা নিজেও অনেক সময় মনে করতে পারেন না। এমনকি অল্পের জন্য যেসব ট্রফি জিততে পারেননি, তা ভেবেও ক্লপের মন বেদনায় ভরে উঠে না। তিনি কেবল মনে রাখেন খেলোয়াড় ও সমর্থকদের সঙ্গে নিজের স্মৃতিগুলো। ২০১৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্লপ বলেছিলেন, ‘ফুটবলের এই দিকটি মানুষের মনে থাকে না। ফল, আপনি ভুলে যাবেন। কারণ, সেখানে অনেক ভালো-মন্দ মিলেমিশে থাকে। কিন্তু সেই ছেলেগুলোকে, জীবনের সেই সময়টা এবং সেই ছোট গল্পগুলো আমি কখনো ভুলতে পারব না।’ ফুটবল তাই ক্লপের জন্য নিছক কোনো খেলা নয়। এটি খেলোয়াড়দের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এবং জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার একটা ভাষাও।

ক্লাবগুলোর সঙ্গে ক্লপের সম্পর্ক সাধারণ কোচ-ক্লাবের সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু। এর আগে মেইঞ্জ এবং ডর্টমুন্ড থেকে ক্লপ যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন শেষ মুহূর্তে এমন কেউ ছিল না, যার চোখ অশ্রুসজল হয়নি।

আর এ কারণেই ক্লাবগুলোর সঙ্গে ক্লপের সম্পর্ক সাধারণ কোচ-ক্লাবের সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু। এর আগে মেইঞ্জ এবং ডর্টমুন্ড থেকে ক্লপ যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন শেষ মুহূর্তে এমন কেউ ছিল না, যার চোখ অশ্রুসজল হয়নি। আগামীকাল একই দৃশ্য দেখা যাবে লিভারপুলের ড্রেসিংরুমেও। অবশ্য এর মধ্যেই গোটা লিভারপুল শহর ক্লপকে হারানোর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। দেয়ালগুলো ভরে উঠেছে ক্লপকে নিয়ে বানানো দেয়ালচিত্রে। রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছে ক্লপকে নিয়ে বানানো কাটআউটের। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদে একটি হৃদয় যতটা জর্জরিত হয়, লিভারপুল শহরের অবস্থাও এখন তেমনই। ক্লপ-লিভারপুল ভালোবাসার এই বন্ধন আধুনিক ফুটবলেরই এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পেশাদারত্ব ও যান্ত্রিকতা যখন ফুটবলকে পুঁজির চাদরে ঢেকে দিয়েছে, ক্লপ-লিভারপুল সাড়ে আট বছর ধরে ভিন্ন এক গল্পই সেখানে লিখে গেছেন।  এবার আসা যাক ক্লপের কৌশলের জাদুকরির প্রসঙ্গে। এখানে সবার আগে যে নামটি আসে সেটি হলো উলফগ্যাং ফ্রাঙ্ক। ১৯৯৫-৯৭ ও ১৯৯৮-২০০০ পর্যন্ত দুই মেয়াদে মেইঞ্জের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এ কোচ। জার্মান এই কোচ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন ইতালিয়ান কোচ অ্যারিগো সাচ্চি দ্বারা। ফলে কোচিংয়ের কৌশল হিসেবে হাই প্রেসিং ও জোনাল মার্কিং ছিল ফ্রাঙ্কের প্রথম পছন্দ। তবে এসব কৌশল সে সময় জার্মান ফুটবলের সঙ্গে মানানসই ছিল না। সবাইকে চমকে দিয়ে এ কৌশলে দারুণ উন্নতি করে মেইঞ্জ। আর এই ফ্র্যাঙ্কের এই কৌশলকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন ক্লপ। ২০২১ সালে এক সাক্ষাৎকারে, ফ্রাঙ্ককে তাঁর দেখা সেরা কোচ বলেও মন্তব্য করেন ক্লপ। সেই ফ্রাঙ্কের অনুপ্রেরণাতেই ২০০১ সালে কোচ হিসেবে এই ক্লাবের হয়েই যাত্রা শুরু করেন ক্লপ।

দায়িত্ব নিয়ে মেইঞ্জকে অবিশ্বাস্য সাফল্য এনে ক্লপ। তাঁর হাত ধরেই প্রথমবারের মতো ক্লাবটিকে উঠে আসে বুন্দেসলিগায়। অথচ ক্লপের নিজের কখনো বুন্দেসলিগায় খেলার সুযোগ হয়নি। ব্যক্তির ওপর গুরুত্ব কম দিয়ে একটা নিজস্ব পদ্ধতি গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই এই সাফল্য নিশ্চিত করেন ক্লপ। তবে কোচ হিসেবে একপর্যায়ে গুরু ফ্রাঙ্ককেও ছাড়িয়ে যান ক্লপ। ফ্রাঙ্কের সঙ্গে ক্লপের পার্থক্য ছিল মূলত ম্যান ম্যানেজমেন্ট ও সিস্টেম গড়ে তোলায়। এ ছাড়া পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দিক থেকেও ক্লপ ছিলেন অনন্য।মেইঞ্জের হয়ে দারুণ সাফল্যই জার্মান ক্লাবগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে আসে ক্লপকে। বায়ার্ন মিউনিখেরও আগ্রহ ছিল তাঁকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বায়ার্ন ক্লপকে নিতে ব্যর্থ হলে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড দলে টানে তাঁকে। তবে মেইঞ্জে ক্লপ যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন, তার প্রতিদান ক্লাবটির সমর্থকেরা দিয়েছিলেন তাঁর বিদায়ের দিন। বিদায় নেওয়ার সময় ক্লপকে ধন্যবাদ জানাতে হাজির হয়েছিলেন প্রায় ৩০ হাজার সমর্থক।

কোচ হিসেবে বিকাশে ক্লপের দ্বিতীয় অনুপ্রেরণা ছিলেন ‘ফাদার অব গেগেনপ্রেসিং’ খ্যাত রালফ রাংনিক। প্রেসিং ফুটবলের বিকাশে যিনি পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু রাংনিক যদি এই ফুটবলীয় দর্শনতত্ত্বের হেগেল হন, তবে ক্লপ হচ্ছেন তার কার্ল মার্ক্স। প্রকৃত অর্থে এই গেগেনপ্রেসিং চূড়ান্ত উৎকর্ষ লাভ করেছে ক্লপের হাতেই। প্রথমে ডর্টমুন্ড এবং পরবর্তী সময়ে লিভারপুলে এই কৌশলে দলকে খেলিয়ে ফুটবলে নতুন রোমাঞ্চ উপহার দেন ক্লপ। তবে এমন না যে এই কৌশলে কেবল খেলার আনন্দই সার হয়েছে, বরং এটি ছিল দারুণ ফলপ্রসূও। ক্লপের অধীনে ডর্টমুন্ডের দুটি লিগ জেতা এবং লিভারপুলের সম্ভাব্য সব শিরোপা জেতা সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। ক্লপের কৌশলগত বিপ্লবের প্রসঙ্গ অবশ্য এত অল্প কথায় শেষ হওয়ার নয়। সামনের দিনগুলোতেও এ নিয়ে হয়তো অনেক গবেষণা হবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কোচদের জন্যও এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে৷ক্লপের ক্যারিয়ারে লিভারপুল থেকে তাঁর বিদায়ও ভবিষ্যতের কোচদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। কোচের কাজ কেবল দলকে খেলানো এবং জয়–পরাজয়ের বিষয় নয়। এটি তার চেয়েও বেশি কিছু। বিদায়বেলায় ক্লপকে নিয়ে লিভারপুল সমর্থকদের শোক ও বিষাদের মর্সিয়া সেই কথায় বারবার বলছে। ক্লপ লিভারপুলে নিজের চিরায়ত উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন। আজ থেকে অনেক বছর পরও ক্লপের সেই উত্তরাধিকারকে কেউ চাইলে অ্যানফিল্ডের ঘাসের ফসিল থেকে খুঁজে নিতে পারবেন। পাশাপাশি ক্লপ লিভারপুলের ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’র যে স্পিরিট, সেটাকেও রেখে যাচ্ছেন তূরীয় উচ্চতায়। সেটি না হলে ক্লপ কখনো বলতে পারতেন না, ‘আমি ভবিষ্যতে কখনো লিভারপুল ছাড়া ইংল্যান্ডের অন্য কোনো ক্লাবের কোচ হব না।’ আধুনিক ফুটবলে এ বড়ই বেমানান কথা। আর এ জন্যই ক্লপ আলাদা। যেমন আলাদা তাঁর ‘হেভিমেটাল ফুটবল।’

আর্সেনালের কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের আত্মজীবনীমূলক বই ‘মাই লাইফ ইন রেড অ্যান্ড হোয়াইট’-এর একটি কথা দিয়ে এই লেখার ইতি টানা যাক। ওয়েঙ্গার এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘আমি প্রায়ই ভাবি, মৃত্যুর পর সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আমার প্রথম কথা কী হবে, তা নিয়ে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, জীবনে কী করেছিলে, আমি জীবনকে কীভাবে অর্থবহ করেছি! আমি তাঁকে বলব, আমি চেষ্টা করেছি ম্যাচ জেতার। “এটুকুই?” তিনি জিজ্ঞেস করবেন। হতাশও হবেন। আমি তখন তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করব, আপনি যেমনটা ভাবছেন ম্যাচ জেতা তার চেয়ে অনেক কঠিন।’হ্যাঁ, এই কাজটা সত্যিই অনেক কঠিন। কিন্তু যখন নিজের কৌশল, আদর্শ ও নীতিকে ঠিক রেখে এই কাজ করতে হয়, তবে সেটি আরও বেশি কঠিন। আর এক কাজটিই লিভারপুলে সাড়ে আট বছর ধরে করে গেছেন ক্লপ। আর এ জন্যই তিনি অতুলনীয়। কোচদের যদি বিভিন্ন সেটে ভাগ করা হয়, তবে ক্লপ সেখানে এমন একটি সেটে পড়বেন, যেখানকার মানুষগুলো এখন প্রায় বিলুপ্ত। আর সে কারণেই ক্লপের দ্যুতিও দিগন্তবিস্তৃত। তাই ক্লপ হয়তো আপাতত থামছেন, কিন্তু যে চিরন্তন চেতনা তিনি রেখে যাচ্ছেন, তার কোনো বিরাম নেই। ওই যে কবি উৎপলকুমার বসু তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, ‘সূর্য ডোবা শেষ হলো কেননা সূর্যের যাত্রা বহুদূর।’

সম্পরকিত প্রবন্ধ

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য