স্যন্দন
ডিজিটাল
ডেস্ক, আগরতলা।
২৬ অক্টোবর :হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ক্যালসিয়াম গ্রহণ ও নিয়মিত শরীরচর্চার
উপর সাধারণত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু হাড়ের শক্তি ও গঠন বজায় রাখার ক্ষেত্রে
বিপাকীয় প্রক্রিয়া, হরমোনের ভারসাম্য, কিডনির কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী
রোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যার
মতো কিছু রোগ হাড়ের গুণমান ও শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে অস্টিওপোরোসিস এবং
হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডায়াবেটিস কীভাবে হাড়ের
ক্ষতি করে?
ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার
মাত্রাকেই প্রভাবিত করে না, হাড়ের স্বাস্থ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে
ইনসুলিনের ঘাটতি এবং হাড়ের স্বাভাবিক বিকাশে পরিবর্তনের কারণে হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে
পারে।
অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে
অনেক সময় হাড়ের ঘনত্ব স্বাভাবিক থাকলেও তার গুণমান ও শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হাড়ের কোলাজেনের গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে,
যা হাড়ের শক্তি বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে
স্নায়ুর ক্ষতি, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি
তৈরি হতে পারে। এর ফলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
তাই হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে
হাড় ভাঙার ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
থাইরয়েডের হরমোনের ভারসাম্য
কেন জরুরি?
হাড়ের পুরনো অংশ ভেঙে
নতুন হাড় তৈরির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাইরয়েড
হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শরীরে থাইরয়েড হরমোনের
মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে হাড় ভাঙার বা ক্ষয় হওয়ার প্রক্রিয়া নতুন হাড় তৈরির তুলনায়
দ্রুত হতে পারে। ফলে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসা না
করা হাইপারথাইরয়েডিজম কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ গ্রহণের
ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি
এবং মেনোপজ-পরবর্তী মহিলাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তবে হাইপোথাইরয়েডিজমের
সঙ্গে হাড়ের ক্ষয়ের সম্পর্ক এতটা সরল নয়। রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকা, অন্যান্য শারীরিক
সমস্যা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত কিছু বিষয় সামগ্রিক পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব
ফেলতে পারে।
অন্যান্য কোন রোগে দুর্বল
হতে পারে হাড়?
ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের
সমস্যা ছাড়াও একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগ হাড়ের শক্তি কমিয়ে দিতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগ:
কিডনি ভিটামিন ডি-এর বিপাক এবং শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য
করে। কিডনির কার্যকারিতা গুরুতরভাবে কমে গেলে হাড় ও খনিজের বিপাকীয় প্রক্রিয়া ব্যাহত
হতে পারে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস:
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হাড়ের ক্ষয় বাড়াতে পারে। চলাফেরা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন স্টেরয়েড
ব্যবহারের কারণেও ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
সিলিয়াক রোগ ও পুষ্টি শোষণের
সমস্যা: অন্ত্রে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর শোষণ কমে গেলে হাড়ের স্বাভাবিক খনিজায়ন
ব্যাহত হতে পারে।
অকাল মেনোপজ ও ইস্ট্রোজেনের
ঘাটতি: ইস্ট্রোজেন হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই হরমোনের মাত্রা কমে গেলে
হাড়ের ক্ষয় দ্রুত হতে পারে।
দীর্ঘদিন ওষুধ খেলেও কি
হাড়ের ক্ষতি হতে পারে?
কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার
করলে হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। এর মধ্যে মুখে খাওয়ার কর্টিকোস্টেরয়েড, যেমন প্রেডনিসোলোন,
উল্লেখযোগ্য। কিছু মৃগীরোগের ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসাও হাড়ের বিপাক বা পড়ে যাওয়ার
ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ
ছাড়া কোনও নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা বা তার মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী
চিকিৎসক হাড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কিংবা বিকল্প চিকিৎসার পরামর্শ
দিতে পারেন।
হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো
রাখতে কী করবেন?
দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত
ব্যক্তিদের হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়েও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। বিশেষ করে প্রবীণ
ব্যক্তি, মেনোপজ-পরবর্তী মহিলা, সামান্য আঘাতে আগে হাড় ভেঙেছে এমন ব্যক্তি এবং দীর্ঘদিন
হাড়ের ক্ষতি করতে পারে এমন ওষুধ গ্রহণকারীদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক
হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয়ের জন্য ডিএক্সএ (DXA) পরীক্ষা, ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং
প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের
ক্ষেত্রে হাড়ের ঘনত্ব স্বাভাবিক হলেও হাড়ের গুণমান ও ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি আলাদাভাবে
মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।
হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো
রাখতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার—
• খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন
রাখা।
• চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যাপ্ত ভিটামিন
ডি নিশ্চিত করা।
• নিয়মিত ওজন বহনকারী ব্যায়াম এবং পেশি শক্তিশালী
করার শরীরচর্চা করা।
• বাড়িতে পিছলে পড়া বা হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকি
কমানো।
• ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী
রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
• দীর্ঘদিনের ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
হাড়ের স্বাস্থ্য কেবল
ক্যালসিয়াম গ্রহণ বা শরীরচর্চার উপর নির্ভরশীল নয়। হরমোনের ভারসাম্য, বিপাকীয় স্বাস্থ্য
এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের যথাযথ নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ,
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে হাড়ের ক্ষয় ও ফ্র্যাকচারের
ঝুঁকি কমানোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদন সূত্র: The
Week, ২৫ অক্টোবর ২০২৬। মূল নিবন্ধের লেখক ডা. অশ্বানি মাইচাঁদ, দিল্লির সি কে বিড়লা
হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের প্রধান।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান