স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, আগরতলা। ২৪ সেপ্টেম্বর : হাঁটার উপকারিতা নিয়ে আলোচনা হলেই প্রতিদিন ১০ হাজার পা হাঁটার লক্ষ্যটির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যস্ত মানুষ কিংবা বয়স্কদের অনেকের কাছেই প্রতিদিন চার-পাঁচ মাইল হাঁটা বাস্তবসম্মত নয়।
এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব না হলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ২০২৬ সালের তিনটি নতুন গবেষণার বরাত দিয়ে Psychology Today জানিয়েছে, একটু দ্রুত হাঁটা অথবা কিছুটা দীর্ঘ সময় একটানা হাঁটলেও একই ধরনের বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য হাঁটা
২০২৬ সালের জুলাইয়ে Translational Psychiatry জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৬৬,৪৮৩ জন ইউকে বায়োব্যাংক অংশগ্রহণকারীর কবজিতে পরা অ্যাক্সিলেরোমিটারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষক কলিন সাকাল ও তাঁর সহকর্মীরা শুধু মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রমের মোট সময় বিবেচনা করেননি; দিনের বিভিন্ন সময়ে সেই শারীরিক কর্মকাণ্ড কীভাবে ছড়িয়ে ছিল, সেটিও তাঁরা বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, অল্প অল্প করে বারবার হাঁটার পরিবর্তে তুলনামূলক দীর্ঘ সময় একটানা শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে। মোট শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বিবেচনা করেও এই সম্পর্ক দেখা গেছে।
কমপক্ষে ১৩ মিনিট স্থায়ী মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম দেখা যায়। অন্যদিকে, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ক্ষেত্রে ৩৬ মিনিটের মতো দীর্ঘ সময়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সবচেয়ে কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যাঁদের শারীরিক কর্মকাণ্ড কম খণ্ডিত ছিল, তাঁদের ডিমেনশিয়া, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি খণ্ডিত কর্মকাণ্ডের মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
উচ্চ-রেজোলিউশনের এমআরআই স্ক্যানেও দেখা যায়, একটানা শারীরিক কর্মকাণ্ড মস্তিষ্কের স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাম হিপোক্যাম্পাসের আয়তন তুলনামূলকভাবে বেশি বজায় রাখার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালির ক্ষতির সূচক হিসেবে বিবেচিত হোয়াইট ম্যাটার হাইপারইনটেনসিটির পরিমাণও কম ছিল।
আলঝাইমার রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেনেটিক ঝুঁকির কারণ APOE4 জিন বহনকারীদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় ধরে একটানা শারীরিক কর্মকাণ্ড জেনেটিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সুরক্ষামূলক সম্পর্ক দেখিয়েছে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে দ্রুত হাঁটার উপকার
জুলাইয়ে Neurology জার্নালে প্রকাশিত দ্বিতীয় একটি গবেষণায় ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের জ্ঞানীয় বার্ধক্য ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর নজর দেওয়া হয়।
ওশাদি জয়াকোডির নেতৃত্বে গবেষকরা পাঁচটি আন্তর্জাতিক গবেষণাগোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা এমন বয়স্ক ব্যক্তিদের ‘সুপার মুভার’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যাঁদের হাঁটার গতি একই বয়স ও লিঙ্গের মানুষের গড় গতির তুলনায় অন্তত ১.৫ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন বেশি।
গবেষণায় দেখা যায়, চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ‘সুপার মুভার’দের জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৫১ শতাংশ কম ছিল।
তাঁদের জ্ঞানীয় অবনতিও ধীরগতির ছিল এবং হিপোক্যাম্পাসের নির্দিষ্ট অংশের আয়তন তুলনামূলকভাবে বেশি বজায় ছিল।
RUSH
Memory and Aging Project-এর তথ্য থেকেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ‘সুপার মুভার’দের জীবদ্দশায় জ্ঞানীয় কর্মক্ষমতা ভালো ছিল এবং আলঝাইমার ও ডিমেনশিয়ার প্রবণতাও কম ছিল।
তবে মৃত্যুর পর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে ডিমেনশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত রোগগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
Psychology
Today-এর প্রতিবেদনে এই পার্থক্যটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাটি দ্রুত হাঁটা আলঝাইমার রোগ প্রতিরোধ করে—এমন দাবি করে না। বরং, সাধারণত ডিমেনশিয়ার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের রোগগত পরিবর্তন থাকলেও ভালো শারীরিক চলনশক্তি বা mobility বেশি জ্ঞানীয় স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে।
দ্রুত বা দীর্ঘ সময় হাঁটলে মৃত্যুঝুঁকি কমতে পারে
সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণা ৮ সেপ্টেম্বর British Journal of Sports Medicine-এ প্রকাশিত হয়। এতে ইউকে বায়োব্যাংকের ৬৪,৭৪৩ জন অংশগ্রহণকারীর কবজিতে পরা অ্যাক্সিলেরোমিটারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষক লে ওয়েই ও তাঁর সহকর্মীরা হাঁটার গতি এবং প্রতিদিনের পদক্ষেপের বিভিন্ন সমন্বয়ের সঙ্গে সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি ও হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণার ফলাফল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক পদক্ষেপের কঠোর লক্ষ্যই স্বাস্থ্যগত উপকারের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
কম পরিমাণে হাঁটলেও যদি হাঁটার গতি বাড়ানো যায়, তাহলে বেশি সময় ধীরে হাঁটার মতোই স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
যাঁরা দিনে গড়ে ৫,০০০-এর কম পদক্ষেপ হাঁটেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ৩০ মিনিটের সর্বোচ্চ হাঁটার গতি প্রতি মিনিটে ৮০ পদক্ষেপ হলে সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া যায়।
প্রতিদিন ৫,০০০ থেকে ৭,৫০০ পদক্ষেপ হাঁটা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিটে ৬০ পদক্ষেপের গতিও গবেষণায় সবচেয়ে কম সক্রিয় গোষ্ঠীর তুলনায় কম মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে কম মৃত্যুঝুঁকি দেখা যায় প্রতিদিন ৭,৫০০ থেকে ১০,০০০ পদক্ষেপ হাঁটা ব্যক্তিদের মধ্যে। প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ পদক্ষেপের দ্রুত গতিতে হাঁটার সঙ্গে সবচেয়ে অনুকূল সম্পর্ক দেখা যায়।
হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
BMJ
Group-এর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গবেষকরা জানিয়েছেন, কম সময় বা কম পরিমাণে হাঁটলেও বেশি তীব্রতায় হাঁটা, বেশি সময় কম তীব্রতায় হাঁটার কাছাকাছি স্বাস্থ্যগত উপকার দিতে পারে।
প্রতিদিনের হাঁটা থেকে কীভাবে আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়
গবেষণাগুলোর ফলাফল থেকে বোঝা যায়, হাঁটার উপকার পেতে শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক পদক্ষেপ পূরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। হাঁটার গতি ও সময়—দুটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাও কার্যকর হতে পারে।
ছোট ছোট হাঁটাকে একত্র করুন:
সম্ভব হলে বারবার অল্প সময় হাঁটার পরিবর্তে একটানা ১৫ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করা যেতে পারে।
পদক্ষেপের সংখ্যার বদলে গতির দিকে নজর দিন:
সময় বা শারীরিক সক্ষমতার কারণে বেশি পদক্ষেপ হাঁটা সম্ভব না হলে দ্রুতগতিতে হাঁটা একটি বিকল্প হতে পারে। প্রতি মিনিটে প্রায় ৮০ বা তার বেশি পদক্ষেপ—অর্থাৎ প্রতি ১৫ সেকেন্ডে প্রায় ২০ পদক্ষেপ—কমপক্ষে ৩০ মিনিট ধরে হাঁটার একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে।
সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নিন:
যেদিন দীর্ঘ সময় ধীরে হাঁটার মতো সময় নেই, সেদিন অল্প সময় দ্রুত হাঁটা যেতে পারে। হাঁটার গতি ও সময়ের মধ্যে পরিবর্তন এনে হাঁটাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
নিয়মিত হাঁটেন এমন মানুষের জন্য লক্ষ্যটা ‘১০ হাজার পদক্ষেপ না হলে কিছুই নয়’—এমন হওয়া জরুরি নয়।
বরং প্রশ্ন হতে পারে, প্রতিদিন ১০ হাজার পদক্ষেপ পূরণ করার পরিবর্তে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা সম্ভব কি না।
অবশ্যই পদক্ষেপের সংখ্যা এখনও একটি সহজ ও কার্যকর মাপকাঠি, বিশেষ করে স্মার্টফোন ও ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যবহার করে তা সহজেই হিসাব করা যায়। তবে হাঁটার গতি, সময় এবং একটানা হাঁটার বিষয়গুলোও এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়, যা শুধুমাত্র প্রতিদিনের মোট পদক্ষেপের সংখ্যা থেকে জানা সম্ভব নয়।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান