Friday, August 7, 2026
বাড়ি জাতীয় বুদ্ধের পবিত্র অবশেষ লেহে পৌঁছল, লাদাখ জুড়ে উৎসবের আবহ

বুদ্ধের পবিত্র অবশেষ লেহে পৌঁছল, লাদাখ জুড়ে উৎসবের আবহ

বুদ্ধের পবিত্র অবশেষ লেহে পৌঁছল, লাদাখ জুড়ে উৎসবের আবহ

লেহ, ২৯ এপ্রিল (হি.স.): লাদাখের আকাশে বুধবার সকালে বিশেষ একটি বিমান অবতরণ করে। সেই বিমানে ছিল এক অমূল্য ঐতিহ্য—গৌতম বুদ্ধের পবিত্র অবশেষ। দিল্লি থেকে আনা এই অবশেষকে ঘিরে লেহ শহরে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ আবেগ, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানা ছাড়িয়ে ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে।

বিমানবন্দরে অবতরণের পর বৌদ্ধ ধর্মগুরু, ভিক্ষু এবং প্রশাসনিক কর্তারা প্রথা মেনে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে অবশেষগুলিকে স্বাগত জানান। এই অবশেষকে ‘রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা’ দেওয়া হয়েছে—যা এর গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক মূল্যকেই তুলে ধরে। সেখান থেকে এগুলিকে নিয়ে যাওয়া হয় চোগলমসরের জেভেতসাল এলাকায়, যেখানে সাধারণ মানুষের দর্শনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে জেভেতসাল পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ জুড়ে ছিল মানুষের ঢল। রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ ফুল ছড়িয়ে, প্রার্থনা করে এই পবিত্র অবশেষকে অভ্যর্থনা জানায়। অনেকের চোখে ছিল আবেগ, কারও হাতে প্রার্থনার মালা—একটি গভীর আধ্যাত্মিক মুহূর্ত যেন শহরটিকে ঘিরে ধরেছিল।

১ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এই অবশেষ সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শিত হবে। এই সময়ের মধ্যে লাদাখে বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ভক্তদের আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণে প্রশাসন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় বিশেষ জোর দিয়েছে। বহুস্তরীয় নিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি, ড্রোন পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে গোটা এলাকা কড়া নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।

শুধু নিরাপত্তাই নয়, দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য চিকিৎসা শিবির, পানীয় জলের ব্যবস্থা, অস্থায়ী শৌচালয় ও পরিবহণ পরিষেবাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখান থেকে গোটা আয়োজনের উপর নজর রাখা হচ্ছে।

বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন, অর্থাৎ ১ মে, এখানে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। বিভিন্ন বৌদ্ধ পরম্পরার ভিক্ষুরা প্রার্থনা, ধ্যান ও আচার সম্পন্ন করবেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকবে, যেখানে লাদাখের নিজস্ব সংগীত ও নৃত্যের পরিবেশনা দেখা যাবে।

এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং একাধিক বৌদ্ধ দেশের কূটনীতিকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে এই আয়োজন আন্তর্জাতিক গুরুত্বও পাচ্ছে।

লেহ শহরকেও এই উপলক্ষে সাজিয়ে তোলা হয়েছে নতুনভাবে। রাস্তাঘাট, চত্বর, পর্যটনকেন্দ্র—সব জায়গাতেই আলোকসজ্জা ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলছে, যা পুরো এলাকাকে এক উৎসবমুখর রূপ দিয়েছে।

এই পবিত্র অবশেষগুলির ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। উত্তর প্রদেশের পিপরাহওয়া স্তূপে ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ আমলে খননকাজে এগুলি আবিষ্কৃত হয়। পরে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণও এর সত্যতা নিশ্চিত করে। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাপরিনির্বাণের পর বুদ্ধের অবশেষ আট ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সম্রাট অশোক পরে এগুলি পুনরায় সংগ্রহ করে বহু স্তূপ নির্মাণ করেন, যার মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটে।

গত কয়েক বছরে এই অবশেষ ভারত ছাড়াও মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও মায়ানমারের মতো দেশে প্রদর্শিত হয়েছে। প্রতিটি জায়গাতেই বিপুল সংখ্যক মানুষ এগুলি দর্শন করতে ভিড় জমিয়েছেন।

লাদাখে এই প্রদর্শনী শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি এক ঐতিহাসিক পুনর্মিলন, যেখানে অতীত ও বর্তমান একসূত্রে বাঁধা পড়েছে। বহু বছর পর এই অবশেষের আগমন স্থানীয় মানুষের কাছে তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

Subrata Debnath
Subrata Debnath https://syandanpatrika.in
সাংবাদিক (Journalist)

মন্তব্য সমূহ (0)

  • এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

আপনার মতামত জানান

Captcha