স্যন্দন ডিজিটেল ডেস্ক, সেপ্টেম্বর ২৬ : মেয়েকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে দুশ্চিন্তায় মায়ের রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে যেত। এই যুক্তিতে এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপান যাওয়ার কথাই তাঁকে জানাননি সীমা কুমারী। ভেবেছিলেন, বেঙ্গালুরুর প্রশিক্ষণ শিবিরেই রয়েছেন। এমনটাই মনে করবেন ৭৮ বছরের মা। কিন্তু আইচি-নাগোয়ায় এশিয়ান গেমসে গিয়ে ১০ হাজার মিটারে ব্রোঞ্জ জিতে তা আর গোপন রইল না। সব মিলিয়ে শুক্রবার মন্দ-ভালো-সাদা-কালোয় কাটল ভারতের।
মহিলাদের ১০ হাজার মিটার দৌড় ৩২ মিনিট ৫০.০৫ সেকেন্ডে শেষ করে চমকে দিয়েছেন ২৫ বছরের সীমা। কেবল চমক দেওয়াই নয়, হিমাচল প্রদেশের চাম্বা জেলার রেটা গ্রামের অ্যাথলিট নজির গড়ে ব্রোঞ্জও জিতেছেন। এই ইভেন্টে পদকজয়ী ভারতীয়দের তালিকায় তৃতীয় সীমা। এর আগে ২০১০ সালের এশিয়ান গেমসে প্রিজা শ্রীধরন সোনা এবং কবিতা রাউত রুপো জিতেছিলেন। পদক জয়ের পরে সীমা বলেন, “আমার বাবা আর নেই। মা খুবই বয়স্ক। বয়স প্রায় ৭৮। আমি যখন বাইরে যাই, খুব চিন্তা করেন। তাই এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপান যাওয়ার কথা মাকে বলিনি।”
কেন এমন সিদ্ধান্ত? সীমার কথায়, “মায়ের হাই ব্লাড প্রসার। আমি যখন প্রশিক্ষণ শিবিরে যাই কিংবা কোনও প্রতিযোগিতায় অংশ নিই, তখন বেশি কিছু বলি না। শুধু দিদিকে জানাই। মা জানতে পারলে তো ঘুমোতেই পারবেন না।” পদক জয়ের পরে অবশ্য খবর আর চাপা থাকার কথা নয়। মা হয়তো ইতিমধ্যেই টেলিভিশনে মেয়েকে দেখে ফেলেছেন। সীমা বললেন, “দিদি হয়তো মাকে জানিয়েছে। ওঁরা হয়তো টেলিভিশনে আমাকে দেখেছেন। তা না হলে মা এখনও ভাবছেন, আমি বেঙ্গালুরুর সাই সেন্টারেই আছি।”
৬ সদস্যের পরিবারের সবচেয়ে ছোট সীমা। বাবা মারা যান যখন, তাঁর বয়স মাত্র ১২। ছোটবেলার দিন কেটেছে খালি পায়ে দৌড়ে। একটা সময় গরুও চরাতে হয়েছে। গ্রামবাসীদের অনেকেই নাক সিটকেছিলেন। মেয়ের অ্যাথলেটিক্সে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন তাঁর মা। সেই মেয়েই এশিয়াডে পদক জিতে দেশকে গর্বিত করে বললেন, “এটা আমার প্রথম এশিয়ান গেমস। ব্রোঞ্জ জিতে আমি গর্বিত। আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পরিকল্পনা ছকেই দৌড়েছিলাম। সবাই সময়ের দিকে নয়, পদকের দিকে তাকিয়ে দৌড়চ্ছিল। আমিও ভেবেছিলাম, প্রথম এশিয়ান গেমস, পদকের জন্যই লড়ব। সোনার জন্যই লড়াই করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ পেয়েছি। তাতেও আমি খুশি।”
তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না সীমা। ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ৫ হাজার মিটারের ইভেন্ট। সেখানে পদকের রং বদলানোর লক্ষ্য। “পরের ইভেন্ট ২৮ সেপ্টেম্বর। আমি নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। পদকের রং বদলাতে চাই,” বলেন তিনি। গত বছর বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় গেমসে রুপো জেতা সীমা কোচ স্কট সাইমনের অধীনে অনুশীলন করেন। অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে একই পরিবেশে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানসিক ভাবেও শক্ত করেছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমরা অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে অনুশীলন করি। এতে শুধু পারফরম্যান্স নয়, মানসিক দিক থেকেও অনেক সাহায্য হয়েছে। আমাদের জয়ের মানসিকতা তৈরি হয়েছে। সেরাদের সঙ্গে আমরাও লড়তে পারি।”
শুক্রবার এশিয়াডে সোনালি শুরু করেছিলেন ভারতের কমলজিৎ এবং ইন্দেরজিৎ সিং সুরুচি। ১০ মিটার এয়ার পিস্তল মিক্সড ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন তাঁরা। এটাই চলতি এশিয়াডে ভারতের দ্বিতীয় সোনা। তাছাড়া ১০ হাজার মিটার দৌড়ে রুপো জেতেন গুলবীর সিং। পোল ভল্টে পদকজয়ী প্রথম ভারতীয় অ্যাথলিট হিসাবে ব্রোঞ্জ জিতে ইতিহাস লিখলেন বারানিকা এলাঙ্গোভান। মহিলাদের শটপাটে ১৭.১৭ মিটারের থ্রো করে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন মনপ্রীত কৌর। তবে হতাশ করলেন সাত্ত্বিকসাইরাজ রাঙ্কিরেড্ডি-চিরাগ শেট্টি জুটি।
গত বারের সোনাজয়ীরা থাইল্যান্ডের পিরাটচাই সুখফুন-পাক্কাপন তেররাতসকুল জুটির কাছে হেরে গেলেন ২১-১২, ১৯-২১, ১৪-২১ ব্যবধানে। মহিলাদের ডাবলসে প্রত্যাশা মতোই প্রথম রাউন্ডের বাধা অতিক্রম করেছে গায়ত্রী গোপীচন্দ-তৃষা জলি জুটি। তবে টেবল টেনিসের মিক্সড ডাবলসে পদকও পেয়েছে ভারত। দিয়া চিতালে-মানুষ শাহ জুটি সেমিফাইনালে চিনা জুটির কাছে ৮-১১, ৫-১১, ৮-১১, ২-১১ ব্যবধানে হেরে ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ভারতীয় জুটিকে। ভারতের ঝুলিতে ২ সোনা, ৯ রুপো, ১২ ব্রোঞ্জ-সহ ২৩টি পদক। আগামিকাল পদক সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই নামবে ভারতীয় অ্যাথলিটরা। তবে সোনার সংখ্যা বাড়বে কিনা, তা সময়ই বলবে।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান