স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক ২ আগস্ট : ফুসফুসের ক্যানসারের কথা উঠলেই প্রথম যে চিত্রটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হল সিগারেটের ধোঁয়া। তাই কখনও ধূমপান না করা কারও এই রোগ ধরা পড়লে অনেকেই বিস্মিত হন। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ফুসফুসের ক্যানসার শুধু ধূমপায়ীদের রোগ নয়।
বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রোগী জীবনে কখনও ধূমপান করেননি। পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে এই হার প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ, এমন কিছু ঝুঁকি রয়েছে, যেগুলি প্রতিদিন আমাদের অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করছে, আর তার অনেকগুলিই লুকিয়ে আছে নিজের বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে।
রান্নাঘরের ধোঁয়া: প্রতিদিনের অভ্যাস, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
রান্না ছাড়া সংসার চলে না। কিন্তু খুব বেশি তাপে তেলে ভাজাভুজি, বারবার একই তেল ব্যবহার করা বা দীর্ঘক্ষণ ডিপ ফ্রাই করলে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তাতে থাকে অতি সূক্ষ্ম দূষিত কণিকা এবং এমন কিছু রাসায়নিক, যাদের কয়েকটিকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বছরের পর বছর এই ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করলে ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে কাটান এবং যেখানে চিমনি, এক্সহস্ট ফ্যান বা পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রান্নাঘরের বায়ুচলাচল যত ভালো, ঝুঁকি তত কম।
মশার কয়েল: মশা তাড়াতে গিয়ে ফুসফুসের ক্ষতি?
রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে অনেকেই মশার কয়েল জ্বালান। কিন্তু কয়েল থেকে বের হওয়া ধোঁয়াও পুরোপুরি নিরীহ নয়। এতে থাকে সূক্ষ্ম কণা ও দহনজাত রাসায়নিক, সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে যার কিছু উপাদানের মিল খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
নিয়মিত, বিশেষ করে বন্ধ ঘরে দীর্ঘক্ষণ কয়েল ব্যবহার করলে ফুসফুসের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিয়মিত কয়েল ব্যবহারকারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ধূমপানের সঙ্গে এই অভ্যাস যুক্ত হলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
রান্নার জ্বালানি ও দূষিত বাতাস, দুই-ই উদ্বেগের
ভারতের বহু পরিবার এখনও কাঠ, কয়লা, গোবরের ঘুঁটে বা ফসলের শুকনো অংশ জ্বালিয়ে রান্না করেন। এই জ্বালানি থেকে তৈরি ধোঁয়া বছরের পর বছর শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে থাকলে ফুসফুসের ক্যানসার-সহ শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
অন্যদিকে শহরের মানুষও নিরাপদ নন। বাতাসে ভাসমান পিএম ২.৫ নামের অতি সূক্ষ্ম দূষিত কণাগুলি সহজেই ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) এই দূষণকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতের অধিকাংশ বড় শহরেই এই দূষণের মাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক উপরে থাকে।
ঘরের ভিতরেই আরও কিছু ঝুঁকি
ফুসফুসের ক্ষতির জন্য শুধু রান্নার ধোঁয়া বা মশার কয়েলই দায়ী নয়-
রেডন গ্যাস: মাটি ও শিলাস্তর থেকে নির্গত এই বর্ণহীন ও গন্ধহীন গ্যাস বাড়ির নিচতলা বা বেসমেন্টে জমতে পারে। ধূমপানের পর এটিকে ফুসফুসের ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়।
ধূপকাঠির ধোঁয়া: প্রতিদিন ধূপ জ্বালানোর অভ্যাস থেকেও ক্ষতিকর দূষিত কণার সংস্পর্শে আসতে হয়, যা ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
পরোক্ষ ধূমপান: পরিবারের কেউ ধূমপান করলে সেই ধোঁয়াও অন্য সদস্যদের ফুসফুসের জন্য সমান ক্ষতিকর হতে পারে।
সচেতন হলেই অনেকটা সুরক্ষা
একদিন মশার কয়েল জ্বালানো বা মাঝে মধ্যে ভাজাভুজি করলেই বিপদ নেমে আসে না। সমস্যা তৈরি হয় যখন বছরের পর বছর একই ধরনের দূষিত পরিবেশে নিয়মিত থাকতে হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শই ধীরে ধীরে ঝুঁকি বাড়ায়।
তাই রান্নার সময় জানালা খুলে রাখুন, চিমনি বা এক্সহস্ট ফ্যান ব্যবহার করুন, সম্ভব হলে মশার কয়েলের বদলে নিরাপদ বিকল্প বেছে নিন এবং ঘরের ভিতরে ধূমপান একেবারেই হতে দেবেন না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘদিনের কাশি, অকারণে শ্বাসকষ্ট, কাশির সঙ্গে রক্ত, বুকে অস্বস্তি বা পরিবারে ফুসফুসের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে শুধু ‘আমি তো ধূমপান করি না’ ভেবে নিশ্চিন্ত থাকবেন না। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগ দ্রুত ধরা পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কারণ, ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি সব সময় সিগারেটের ধোঁয়া থেকে আসে না।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান