জ্যাকসন গেট ও এক অগ্নিকন্যার কাহিনী

মানস পাল

আগরতলায় সবাই জানেন জ্যাকসন গেট বলে একটি জায়গা আছে --ঠিক শহরের মধ্যিখানে  তুলসীবতী স্কুল এর সামনে। কিন্তু গেটটি  নতুন প্রজন্মের অনেকেই দেখেননি কারণ ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে এটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল --ওই যা হয়, রাস্তা বড় করতে হবে তাই। 

জ্যাকসন  গেটের সঙ্গে হারিয়ে গেছে এক অসাধারণ স্থাপত্য নিদর্শন শুধু নয় , সঙ্গে হারিয়ে গেছে আরো অজানা কাহিনী। 

 স্যার ফ্র্যান্সিস স্ট্যানলি জ্যাকসন একসময় ছিলেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেট টিমের এক বেশ নামি খেলোয়াড়। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি টিমের ক্যাপ্টেন হিসাবে তিনিই রঞ্জিতসিংজি কে ক্রিকেট দলে নিয়েছিলেন । পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন ১৯২৭ এ।  ছিলেন ১৯৩২ পর্যন্ত।

১৯২৭ তে মহারাজা বীরবিক্রম মানিক্য বাহাদুর-এর অভিষেকের সময় বাংলার গভর্নর হিসাবে তাঁর উপর ন্যস্ত ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদন ইত্যাদি সম্পর্কিত  দায়িত্ব পালনে আগরতলায় এসেছিলেন স্যার ফ্র্যান্সিস স্ট্যানলি জ্যাকসন।  তখন তাঁকে স্বাগতম জানাতে এই গেট টি তৈরী করা হয় , দেখতে অনেকটা উত্তরগেটের মত হলেও স্থাপত্যটি অল্প ভিন্ন ধরণের ছিল যা দেখাই যাচ্ছে। যাঁরা দেখেছেন গেটটি সবাই বলেছেন অপূর্ব সুন্দর ছিল এটি , কিন্তু ভেঙে ফেলা হল।  আমাদের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ বা ভালোবাসার কথা তো আর বলে লাভ নেই , চোখের সামনেই সব দেখতে পাচ্ছেন কিভাবে সব হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

যাই হোক , এখানেই শেষ নয়। 

এই জ্যাকসন সাহেব একবার যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে ভাষণ দিতে গেলেন --সেটা ৬ ফেব্রূয়ারি ১৯৩২ - একটি বিপ্লবী কম বয়েসী হালকা পলকা মেয়ে  বীনা দাস গুটি গুটি পায়ে স্টেজের সামনে গিয়ে জ্যাকসন সাহেবকে  মারার জন্য গুলি চালাল রিভলভার থেকে।  প্রথমে দুটি , পরে আরো দুটি ।  কিন্তু জ্যাকসন সাহেবের গায়ে লাগলোনা , তিনি বেঁচে গেলেন, যদিও একটি গুলি তাঁর কান ছুঁয়ে গিয়েছিলো । এদিকে বীনা দাস কে সবাই পাকড়াও করল , আদালতে মামলা চলল -- সেখানে বীনা দাস কি বলেছিলেন সেটা পড়ে নেবেন পেনিসিলভেনিয়া থেকে প্রকাশিত ''রিডিং ঈগল '' পত্রিকায়  ( তারিখ ১৫ ফেব্রূয়ারি , ১৯৩২ -- গুলি চালানোর নয়দিন পর ),  যা বলেছিলেন তিনি ঐদিন আমি আর  বাংলা  অনুবাদ করার সাহস দেখলাম না।   পড়ে দেখবেন একটি কম বয়েসী বিপ্লবী বাঙালি কন্যার বক্তব্য --মনে পরে যাবে শহীদ ভগৎ  সিংহ এর কথা। 

যাই হোক শুধু ৯ বছরের সশ্রম কারাদন্ড নয় , বীনা দাস-এর গ্র্যাজুয়েশন  সার্টিফিকেটটিও -আটকে রাখা হল। বীনা দাস মারা যাবার পর --৮০ বছর বাদে ২০১৩ সালে তাঁর গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট টি দেয়া হয়। ভারত সরকার তাঁকে ১৯৬০ সালে পদ্মশ্রী দিয়েছিলেন বটে --তা ও ''সামাজিক কাজের'' জন্য। জেল থেকে ছাড়া পাবার পরও  তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে  পুরোপুরি সক্রিয় ছিলেন ১৯৪৭ পর্যন্ত।  তিনি সরকারি সব সাহায্য নিতে চাননি কারণ তিনি মনে করতেন যা করেছেন দেশমাতৃকার জন্য করেছেন।

কিন্তু কিভাবে মারা গেলেন এই অগ্নিকন্যা ?

হৃষিকেশের  পথের ধারে  এক  আশ্রয়হীন , ক্ষুধার্ত  বৃদ্ধা হিসাবে -- সবার অগোচরেই  এই অগ্নিকন্যার মৃত্যু হয় ১৯৮৬ সালের ২৬শে  ডিসেম্বর , কেউ চেনে না , কেউ জানে না । রাস্তা থেকে উঠিয়ে এই বিপ্লবী মহিলার পচা গলা মৃতদেহটি পরে সরকারি ভাবে সৎকার  করা হয়।

বলা দরকার , বীনা দাসের পুরো পরিবারই স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওতপ্রোত ভাবে , তাঁর স্বামীও ছিলেন একজন বিপ্লবী। বীনা দাসের জন্ম ২৪ আগস্ট , ১৯১১। বাবা বেণীমাধব দাস ছিলেন কটকের রেভেনশ কলেজের শিক্ষক , যাঁর ছাত্র ছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্রও। 

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার ডাঃ এম জে পানিক্কর)